আগরতলা, ২৫ সেপ্টেম্বর: ত্রিপুরার সরকারি ডিগ্রি কলেজগুলিতে শিক্ষক সংকটের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ১৭৮ জন অতিথি অধ্যাপককে সহকারী অধ্যাপক পদে বিবেচনার জন্য এককালীন, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি বিস্তারিত প্রতিনিধিপত্র জমা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অতিথি অধ্যাপকেরা।
প্রতিনিধিপত্রের প্রতিলিপি দেওয়া হয়েছে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী, মুখ্যসচিব এবং উচ্চশিক্ষা দপ্তরের সচিবের কাছেও।
আবেদনকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ১৭৮ জন অতিথি অধ্যাপকের অধিকাংশই সরকারি ডিগ্রি কলেজে ৫ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছেন। সাধারণ ও পেশাগত ডিগ্রি কলেজে কর্মরত এই শিক্ষকেরা পাঠদানের পাশাপাশি পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন, ছাত্রছাত্রীদের পরামর্শদান এবং বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তবে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট থেকে তাঁদের অতিথি শিক্ষক হিসেবে পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে একদিকে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে সরকারি কলেজগুলিতে শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে তাঁদের বক্তব্য।
প্রতিনিধিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজ্যের সরকারি কলেজগুলিতে বর্তমানে প্রায় ৫০৭ জন নিয়মিত সহকারী অধ্যাপক এবং প্রায় ৭৩২ জন অতিথি অধ্যাপকের উপর একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ৭৩২ জন অতিথি অধ্যাপকের মধ্যে ১৭৮ জন ইউজিসি-নির্ধারিত প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন এবং তাঁদের ৫ থেকে ১৫ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে দীর্ঘ পরিষেবার ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থায়ীকরণের দাবি তাঁরা করেননি। বরং শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজন, শূন্যপদ এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও নিয়োগবিধি যাচাই করে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন বা নিয়োগ প্রক্রিয়া চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ এবং চার বছরের স্নাতক পাঠক্রম বা এফওয়াইইউজিপি চালুর পর কলেজগুলিতে একাডেমিক দায়িত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিনিধিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন পাঠক্রমে বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের পাশাপাশি গবেষণা পদ্ধতি, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, বিশেষায়িত পাঠ এবং আন্তঃবিষয়ক শিক্ষার মতো বিভিন্ন উপাদান যুক্ত হয়েছে। ফলে শিক্ষক-ছাত্রছাত্রীদের একাডেমিক যোগাযোগ, মূল্যায়ন ও পরামর্শদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত দায়িত্ব তৈরি হয়েছে বলে আবেদনকারীদের বক্তব্য।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ অতিথি শিক্ষকদের পরিষেবা বন্ধ হওয়ায় সরকারি কলেজগুলির একাডেমিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
প্রতিনিধিপত্রে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কোনও সরকারি কলেজে যদি একই বিষয়ের শিক্ষকতার প্রয়োজন বছরের পর বছর ধরে থাকে, তাহলে সেই চাহিদা পূরণে দীর্ঘদিন অস্থায়ী বা অতিথি শিক্ষক ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কতটা কার্যকর। তাঁদের মতে, ৫ থেকে ১৫ বছর ধরে একই কলেজ ব্যবস্থায় শিক্ষকতার প্রয়োজন থাকা দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক চাহিদারই ইঙ্গিত দেয়।
তবে আবেদনকারীরা স্বীকার করেছেন, দীর্ঘ পরিষেবা নিজে থেকেই নিয়মিত সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগের অধিকার সৃষ্টি করে না। সেই কারণে সাংবিধানিক নিয়োগনীতি, ইউজিসি বিধি, রাজ্য সরকারের নিয়োগবিধি এবং আদালতের নির্দেশ মেনে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই করে একটি বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়েছে।
এক্ষেত্রে ত্রিপুরা সরকারের পূর্ববর্তী কয়েকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কথাও প্রতিনিধিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা দপ্তরের ১৫ অক্টোবর ২০২২-এর মেমোরেনডমের মাধ্যমে যোগ্য পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শিক্ষক বা পিজিটিদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শূন্য পদের বিপরীতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদায়ন বা আত্তীকরণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে আবেদনকারীদের দাবি।
এর মাধ্যমে আরও ১৬ জন পিজিটিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শূন্য পদের বিপরীতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদায়ন করা হয় বলেও প্রতিনিধিপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
তবে পূর্ববর্তী ওই ব্যবস্থাগুলির আইনগত ভিত্তি ও বর্তমান পরিস্থিতি অভিন্ন নয় বলে আবেদনকারীরাও স্বীকার করেছেন। তাই পুরনো ব্যবস্থা হুবহু প্রয়োগ না করে বর্তমান আইন ও নিয়োগবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন করে এককালীন ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রার্থীদের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও নির্ধারিত নম্বর, এনইটি /এসএলইটি /এসইটি, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পিএইচডি, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা, ডিগ্রির স্বীকৃতি এবং সরকারি কলেজে শিক্ষকতার নথি যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক ও কলেজভিত্তিক শূন্যপদ নির্ধারণেরও প্রস্তাব রয়েছে।
বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উচ্চশিক্ষা দপ্তর, উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছেন অতিথি অধ্যাপকেরা। এই কমিটি সরকারি কলেজগুলির প্রকৃত শিক্ষক চাহিদা, শূন্যপদ, বিষয়ভিত্তিক একাডেমিক কর্মভার এবং আবেদনকারীদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ করতে পারে বলে তাঁদের বক্তব্য।
প্রতিনিধিপত্রে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ডব্লিউ পি . (সি) নং, ১১০২ /২০২৬ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীদের বক্তব্য, যে কোনও নিয়োগ বা স্থায়ীকরণ প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা কঠোরভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। তাঁদের দাবি, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা যোগ্যতার শিথিলতার জন্য নয়; বরং নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণকারী এবং দীর্ঘদিন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করা ব্যক্তিদের একটি স্বচ্ছ ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় বিবেচনার জন্য।
দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনে সরকারি কলেজগুলিতে অন্তর্বর্তী শিক্ষকতার ব্যবস্থা করার কথাও প্রতিনিধিপত্রে বলা হয়েছে। তাঁদের মতে, চার বছরের স্নাতক পাঠক্রমের বর্তমান কাঠামোয় শিক্ষক সংকট অব্যাহত থাকলে পাঠদান, মূল্যায়ন, পরামর্শদান এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার উপর প্রভাব পড়তে পারে।
এখন ১৭৮ জন অতিথি অধ্যাপকের এই প্রতিনিধিপত্রের পর সরকারি কলেজগুলির শিক্ষক সংকট, শূন্যপদ এবং ভবিষ্যৎ একাডেমিক প্রয়োজনের বিষয়টি রাজ্য সরকার কীভাবে বিবেচনা করে, সেদিকেই নজর রয়েছে।



















