আগরতলা, ৮ আগস্ট: কেন্দ্র ও রাজ্যে বিজেপি সরকারের আমলে খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল, সরকারি সম্পদ লুট, খাদ্যসামগ্রী আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। কিন্তু এসব ঘটনা ঘটার সময় ক্ষমতাসীনদের দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায় না বলে অভিযোগ তুলল ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস। তাদের দাবি, ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর কয়েকজনকে গ্রেপ্তার কিংবা তদন্ত কমিটি গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের পদক্ষেপ লোক দেখানো বলে অভিযোগ কংগ্রেসের।
প্রদেশ কংগ্রেসের বক্তব্য, ক্ষমতাবানদের নাকের ডগায় দিনের পর দিন এত গুরুতর অনিয়ম কীভাবে ঘটে চলেছে, তার জবাব সরকারকে দিতে হবে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে কিংবা তদন্ত কমিটি গঠন করে দায় এড়ানোর চেষ্টা না করে দুর্নীতি ও অনিয়মের মূল কারণ খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছে তারা।
এই প্রসঙ্গে প্রদেশ কংগ্রেস প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর একটি বক্তব্যের উল্লেখ করেছে। কংগ্রেসের বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।
সম্প্রতি আগরতলার একটি রেশন দোকানে খাদ্য দপ্তর থেকে সরবরাহ করা ডালের বস্তা খোলার পর তাতে ছত্রাক ও পচন ধরার অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রদেশ কংগ্রেসের প্রশ্ন, যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কীভাবে মানুষের জন্য বরাদ্দ খাদ্যসামগ্রী রেশন দোকানে পৌঁছল? মানুষের খাওয়ার তো দূরের কথা, পশুরও খাওয়ার অনুপযুক্ত খাদ্য কীভাবে সরকারি রেশন ব্যবস্থায় পৌঁছায়, তা নিয়ে খাদ্য দপ্তরের কাছে জবাব চেয়েছে তারা।
কংগ্রেসের অভিযোগ, ত্রিপুরায় রেশনিং ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে নিয়মিতভাবে চাল, গম, চিনি ও অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে না। রেশন ব্যবস্থায় তেল, মসলা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে প্রদেশ কংগ্রেস।
তাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবিসহ ব্যাগে তেল ও মসলাপাতি দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল এবং প্রতি তিন মাস অন্তর এই ধরনের সামগ্রী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেই প্রশ্ন রয়েছে।
মসলাপাতি সরবরাহের জন্য দরপত্র নিয়েও আগে প্রশ্ন তুলেছিল প্রদেশ কংগ্রেস। তাদের অভিযোগ, সর্বনিম্ন দরদাতার উল্লেখ করা জিরার মূল্য বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কম ছিল। বরাত পাওয়ার পর বাস্তবে নিয়মিত সরবরাহ করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। রেশন ডিলারদের দাবি, ২০০ গ্রাম জিরার প্যাকেট একবার পাওয়ার পর আর নিয়মিতভাবে জিরা সরবরাহ করা হয়নি। তেলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
কংগ্রেসের অভিযোগ, খাদ্য দপ্তরের গোডাউন থেকে চাল লুট, রেশন সামগ্রী সরবরাহে অনিয়ম, নিম্নমানের চাল এবং অনিয়মিত সরবরাহের মতো একাধিক অভিযোগ ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে খাদ্য দপ্তরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রেশন দোকানে সময়মতো চাল, গম ও চিনি না পৌঁছনোর কারণে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে খাদ্যসামগ্রী কিনছেন বলেও দাবি করেছে কংগ্রেস। অধিকাংশ রেশন দোকানে নিম্নমানের চাল সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও ডিলারদের একাংশের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, রেশন ডিলাররা দীর্ঘদিন ধরে কমিশন বৃদ্ধি এবং আগের মতো সরাসরি খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহের ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঠিকাদারনির্ভর করে দেওয়ায় ডিলার ও সাধারণ মানুষ উভয়েই সমস্যায় পড়ছেন বলে অভিযোগ প্রদেশ কংগ্রেসের।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো রেশন দোকানে চিনি সরবরাহ বন্ধ থাকা। কার্ডপিছু প্রতি মাসে এক কেজি চিনি দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও গত দুই থেকে তিন মাস ধরে বহু রেশন দোকানে চিনি সরবরাহ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ। একই সময়ে খোলা বাজারে চিনির দাম বৃদ্ধির বিষয়টিও সামনে এনে কংগ্রেসের প্রশ্ন, রেশনে চিনি সরবরাহ বন্ধ এবং বাজারে চিনির দাম বৃদ্ধির মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রদেশ কংগ্রেসের দাবি, খাদ্য দপ্তরকে অবিলম্বে রেশনিং ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নিতে হবে। খাদ্যসামগ্রীর গুণমান নিশ্চিত করতে হবে এবং নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পচা, নিম্নমানের বা মানুষের ব্যবহারের অনুপযুক্ত খাদ্যসামগ্রী রেশন ব্যবস্থায় পৌঁছানোর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে তারা।
কংগ্রেসের বক্তব্য, “জলে ভিজে গেছে” কিংবা “বিষয়টি জানা ছিল না”-এর মতো অজুহাত দেখিয়ে দায়িত্বশীলরা দায় এড়িয়ে যেতে পারবেন না। সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত এই ব্যবস্থায় কোনও ধরনের গাফিলতি বা অনিয়ম বরদাস্ত করা উচিত নয় বলেই দাবি প্রদেশ কংগ্রেসের।


















