আগরতলা, ২৮ জুলাই:একটি বাড়ির ছাদে কয়েকটি সোলার প্যানেল। সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুৎ যাচ্ছে বাড়ির আলো, পাখা, ফ্রিজ কিংবা অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালাতে। আর বাড়তি বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে গ্রিডে। এভাবেই এক একটি বাড়ি যখন নিজের প্রয়োজনের বিদ্যুৎ নিজেই তৈরি করতে শুরু করেছে, তখন অজান্তেই বদলে যাচ্ছে গোটা রাজ্যের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার চিত্র। ত্রিপুরায় সেই পরিবর্তন এখন আর সম্ভাবনা নয়, বাস্তবতা। পিএম সূর্য ঘর মুফত বিজলি যোজনার হাত ধরে বাড়ির ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ইতিমধ্যেই ১৫ মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে।
এই ১৫ মেগাওয়াটকে তাই নিছক একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ত্রিপুরার বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা। কারণ এই বিদ্যুৎ কোনও একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসছে না। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার সাধারণ মানুষের বাড়ির ছাদ থেকেই তৈরি হচ্ছে এই শক্তি। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের দায়িত্ব এখন আর শুধু বড় প্রকল্প বা সরকারি ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাধারণ মানুষও হয়ে উঠছেন বিদ্যুৎ উৎপাদনের অংশীদার।
২৭ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত পরিসংখ্যান বলছে, পিএম সূর্য ঘর মুফত বিজলি যোজনায় রাজ্যে ১৭,৩৩০টি সৌর আবেদনের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। এর মধ্যে ৭,৮৪৬টি আবেদন জমা পড়েছে এবং সেই আবেদনগুলির প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৪,৭৩৩ কেডব্লিউপি। ইতিমধ্যে ৪,৪৬০টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই স্থাপিত প্রকল্পগুলির সম্মিলিত ক্ষমতা ১৫,৩০০ কেডব্লিউপি বা ১৫.৩ মেগাওয়াট।
এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক সাফল্যও। ইতিমধ্যে ৩,৮৫৩ জন গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ভর্তুকি পৌঁছেছে, যার মোট পরিমাণ ৩২ কোটি ৫২ লক্ষ টাকারও বেশি। অর্থাৎ, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব শক্তির পথে হাঁটার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আর্থিক বোঝাও কমছে।
ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেডের ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ও প্রসারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথের দিকনির্দেশনা এবং বিদ্যুৎ সচিব অভিষেক সিং, আইএএস-এর উদ্যোগে এই প্রকল্পকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। সরকারের লক্ষ্য, রাজ্যের আরও বেশি সংখ্যক পরিবারকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় এনে বাড়ির ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্রে পরিণত করা।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখানেই। সোলার প্যানেল বসানো মানে শুধু বিদ্যুৎ বিল কমানো নয়, চাইলে নিজের বাড়িকেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি ছোট কেন্দ্র করে তোলা। নিজের উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করে বিল শূন্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগও রয়েছে।
এর বাস্তব উদাহরণও সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ত্রৈমাসিকে ১,৬৭৯ জন গ্রাহক নিজেদের বিদ্যুৎ বিল শূন্যে নামিয়ে অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে মোট ৫ লক্ষ ৭৯ হাজার টাকা আয়ের সুযোগ পেয়েছেন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে সেই অর্থ পৌঁছনোর কথা।
ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এখন আহ্বান একটাই—বাড়ির ছাদ খালি রাখবেন না, সূর্যের আলোকে শক্তিতে বদলে ফেলুন। পিএম সূর্য ঘর মুফত বিজলি যোজনা সেই সুযোগই তৈরি করে দিচ্ছে। একটি সোলার প্ল্যান্ট যেমন নিজের পরিবারের বিদ্যুৎ খরচ কমাতে পারে, তেমনই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে তা আয়ের নতুন দরজাও খুলে দিতে পারে।
ত্রিপুরায় ১৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন তাই কোনও শেষ সাফল্য নয়। বরং এটি আরও বড় পরিবর্তনের শুরু। আজ ৪,৪৬০টি বাড়ির ছাদ বিদ্যুৎ তৈরি করছে, আগামী দিনে সেই সংখ্যা আরও বাড়বে। একদিন হয়তো রাজ্যের প্রতিটি বাড়ির ছাদই হয়ে উঠবে একটি করে ক্ষুদ্র বিদ্যুৎকেন্দ্র।



















