নয়াদিল্লি, ২৭ এপ্রিল (আইএএনএস): দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে ৭৯টি তাজা বোমা উদ্ধারের পর ফের শিরোনামে উঠে এল পশ্চিমবঙ্গের অবৈধ বোমা তৈরির কারখানাগুলি। ঘটনার তদন্তভার নিয়েছে জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ), এবং প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর চক্রের অংশ।
সূত্রের খবর, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফার ভোটের মাত্র তিন দিন আগে এই বিপুল পরিমাণ বোমা উদ্ধারের ঘটনাটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তদন্তকারী আধিকারিকদের মতে, নির্বাচনের সময় বোমাবাজি রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন নয়। অতীতেও দেখা গিয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলি প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে বোমাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
এক গোয়েন্দা আধিকারিক জানান, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এ ধরনের একাধিক গোপন ইউনিট রয়েছে, যেখানে নিয়মিত বোমা তৈরি হয়। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, উৎপাদন ততই বেড়ে যায়— তা বিধানসভা হোক বা লোকসভা ভোট।
এই কারখানাগুলির বেশিরভাগই আতশবাজি কারখানার আড়ালে চলে বলে অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্টরা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় প্রশাসনও চোখ বন্ধ করে থাকে বলে দাবি তদন্তকারী মহলের।
তবে সব ক্ষেত্রেই এই বোমা শুধুমাত্র রাজনৈতিক কাজে ব্যবহৃত হয় না বলেও জানিয়েছেন এক আধিকারিক। বর্ধমানের ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরি করা হচ্ছিল, যার একটি ছোট অংশ নির্বাচনকেন্দ্রিক অশান্তির জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল। বাকি অংশ বাংলাদেশে পাঠিয়ে জঙ্গি হামলার ছক কষা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
ওই ঘটনায় জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-র ভূমিকা সামনে আসে। তদন্তে জানা যায়, তারা বিপুল পরিমাণ বোমার অর্ডার দিয়েছিল, যা বাংলাদেশে পাচার করার পরিকল্পনা ছিল।
তদন্তকারীদের মতে, ভাঙড় এলাকায়ও বোমা তৈরির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং তা মূলত রাজনৈতিক সংঘর্ষে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। তাই এই ঘটনায় গভীর তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।
এনআইএ আধিকারিকরা বর্ধমান মামলার নথিও পুনরায় খতিয়ে দেখবেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের মতে, রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই বোমা কারখানাগুলি একদিকে যেমন দুষ্কৃতীদের চাহিদা মেটায়, তেমনই জঙ্গি সংগঠনগুলির কাছেও সরবরাহ করে।
এই কারখানাগুলি চালাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কাজে লাগানো হয় বলে অভিযোগ। তাঁদের দিনে ৭০ থেকে ১০০ টাকা মজুরি দিয়ে বোমা তৈরির কাজে নিযুক্ত করা হয়।
তদন্তে আরও উঠে আসছে, জেএমবি-র মতো সংগঠনের সঙ্গে এই কারখানাগুলির যোগ থাকতে পারে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, পাকিস্তানের আইএসআই জেএমবি-কে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতে হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল এবং সেই উদ্দেশ্যে এই ধরনের কারখানার ওপর নির্ভর করা হত।
আধিকারিকদের মতে, এই কারখানাগুলি শুধু নির্বাচনের সময় নয়, সারা বছরই সক্রিয় থাকে। নির্বাচন না থাকলেও দুষ্কৃতী ও জঙ্গি গোষ্ঠীর কাছে নিয়মিত বোমা সরবরাহ করা হয়। ফলে এই ‘ক্রুড বোমা’ শিল্পের চাহিদা সারা বছরই বজায় থাকে।
এনআইএ এখন খতিয়ে দেখবে কীভাবে এত বড় পরিমাণ বোমা তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করা হল, কারা সরবরাহ করছিল এবং কারা এই কারখানাগুলিকে মদত দিচ্ছিল।
বর্ধমানের ঘটনাটি একপ্রকার সতর্কবার্তা ছিল— সেখানে এক হাজারেরও বেশি বোমা উদ্ধার হয়েছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে কোনও বাধা ছাড়াই এই কারখানাগুলি চলছিল বলে জানা যায়।
তদন্তকারীদের মতে, এই চক্রের গোড়া খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ— কারা জড়িত, কোথা থেকে কাঁচামাল আসছে এবং কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে এতদিন ধরে এই কারবার চলছিল, তারই উত্তর খুঁজবে এনআইএ।
vn/rad


















