পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের দিকে কড়া নজর মোদীর, ভারতীয়দের নিরাপত্তাই প্রধান উদ্বেগ: রাজ্যসভায় জয়শঙ্কর

নয়াদিল্লি, ৯ মার্চ (আইএএনএস): পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান সংঘাত পরিস্থিতির ওপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘনিষ্ঠ নজর রাখছেন এবং ওই অঞ্চলে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তাই সরকারের প্রধান উদ্বেগ—রাজ্যসভায় জানালেন বিদেশমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর।

সোমবার অধিবেশন শুরু হওয়ার পর বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে ভারতীয় নাগরিকদের মৃত্যুর বিষয়টি উত্থাপন করতে গেলে ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে প্রতিবাদ শুরু হয়। এরপর রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি. পি. রাধাকৃষ্ণণ খড়গেকে বক্তব্য শেষ করতে বলেন এবং বিদেশমন্ত্রীকে বক্তব্য রাখতে আহ্বান জানান।

হট্টগোলের মধ্যেই বক্তব্য রাখতে গিয়ে জয়শঙ্কর জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলার পর ইরানকে ঘিরে এই সংঘাত শুরু হয় এবং তাতে ইরানের ইসলামি শাসনের একাধিক শীর্ষ নেতার মৃত্যু হয়েছে। এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, “২০ ফেব্রুয়ারি সরকার একটি বিবৃতি দিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পক্ষকে সংযম বজায় রাখতে, সংঘাত না বাড়াতে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানিয়েছিল। আমরা এখনও মনে করি আলোচনাই এই উত্তেজনা কমানোর একমাত্র পথ।”

জয়শঙ্কর আরও বলেন, ওই অঞ্চলের সব দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটের নিরাপত্তা কমিটি এই সংঘাত পরিস্থিতি এবং সেখানে বসবাসকারী ভারতীয়দের সমস্যার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে। সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী মোদী ইতিমধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, ওমান, জর্ডন, ইজরায়েল এবং বাহরাইন-এর রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

জয়শঙ্কর বলেন, “এই সংঘাত ভারতের জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়, কারণ উপসাগরীয় দেশগুলিতে প্রায় এক কোটি ভারতীয় বাস ও কাজ করেন। ইরানেও কয়েক হাজার ভারতীয় পড়াশোনা বা চাকরির কারণে রয়েছেন।”

তিনি জানান, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। উপসাগরীয় দেশগুলি ভারতের তেল ও গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী এবং এই অঞ্চল ভারতের একটি বড় বাণিজ্য অংশীদার, যেখানে বছরে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়।

বিদেশমন্ত্রী আরও বলেন, এই সংঘাতের প্রভাব সামুদ্রিক পরিবহনেও পড়েছে, যেখানে বহু ভারতীয় নাবিক কর্মরত। “দুঃখজনকভাবে এই ধরনের ঘটনায় ইতিমধ্যেই দুই ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে এবং একজন এখনও নিখোঁজ,” বলেন তিনি।

জয়শঙ্কর জানান, ২০২৫ সালের জুনে হওয়া ১২ দিনের সংঘাতের পর থেকেই সরকার পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিল এবং ইরানে বসবাসকারী ভারতীয়দের সতর্ক করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, জানুয়ারিতে ভারতীয় নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইরান সফর না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে থাকা ভারতীয়দের দূতাবাসে নিজেদের নথিভুক্ত করতে এবং সতর্ক থাকতে বলা হয়।

পরবর্তীতে তেহরানে ভারতীয় দূতাবাস ১৪ ফেব্রুয়ারি এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি আরও সতর্কবার্তা জারি করে, যাতে ভারতীয়দের সব ধরনের উপলব্ধ পরিবহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

বিদেশমন্ত্রী জানান, পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় পরে ভারতীয়দের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে, যার মধ্যে ইরানে পড়াশোনা করা ছাত্রছাত্রীরাও রয়েছেন।

Leave a Reply