নয়াদিল্লি, ১০ জুন (আইএএনএস): স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের ইতিহাসে ১০ জুন একটি বিশেষ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ। তাঁর মতে, এদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু-কে অতিক্রম করে ভারতের দীর্ঘতম সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালনকারী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠেছেন।
‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এ প্রকাশিত একটি বিশেষ নিবন্ধে কোবিন্দ লিখেছেন, “১০ জুন, ২০২৬ স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের ইতিহাসে একটি বিশেষ উপলক্ষ। এই দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জওহরলাল নেহরুকে ছাপিয়ে দেশের দীর্ঘতম সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালনকারী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তবে এই ঐতিহাসিক রেকর্ডের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, তাঁর শাসনকাল স্বাধীনতার পর ভারতের এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সময়কে চিহ্নিত করে।”
তিনি দাবি করেন, ২০১৪ সালের ২৬ মে থেকে ভারতের রাজনৈতিক যাত্রাপথ মহাত্মা গান্ধী, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, ড. বি.আর. আম্বেদকর, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, সি. রাজাগোপালাচারী এবং কে.এম. মুনশিদের কল্পিত ‘ভারতীয়ত্ব’-এর দিকে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হয়েছে।
কোবিন্দের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে মোদি এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেলকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন, যা রাজাগোপালাচারীর চিন্তাধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, রাজাজি নেহরুবাদী অর্থনীতির ‘কোটা, পারমিট ও লাইসেন্স রাজ’-এর কড়া সমালোচক ছিলেন।
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী মোদি বারবার ভারতকে “গণতন্ত্রের জননী” হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, প্রাচীন ভারতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক চর্চার ঐতিহ্য ছিল, যা দীর্ঘদিন যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে ভারতের ভোটার সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটির কাছাকাছি, যা স্বাধীনতার সময় দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় তিনগুণ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৭৪৪টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে, যেখানে ১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল মাত্র ৫৩টি দল।
কোবিন্দ বলেন, “জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের প্রতি নজরদারি নেহরুর সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। এত উচ্চ প্রত্যাশার মধ্যেও মানুষের আস্থা বজায় রাখা মোদির একটি ব্যতিক্রমী সাফল্য।”
তিনি আরও দাবি করেন, একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ তুলনামূলকভাবে কম হলেও মোদি সেই বৈশ্বিক প্রবণতার ব্যতিক্রম।
নিবন্ধে কোবিন্দ বলেন, ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে ভারতীয়দের মধ্যে যে হীনমন্যতার বোধ তৈরি হয়েছিল, তা স্বাধীনতার পরও দীর্ঘদিন বজায় ছিল। তাঁর অভিযোগ, ইংরেজিকে ক্ষমতার ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এবং ভারতীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে অনেক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করা হয়েছিল।
তাঁর বক্তব্য, “নেহরু যুগ এবং তার পরবর্তী সময়ে দেশের অভিজাত শ্রেণির মধ্যে ভারতীয় বিষয়গুলিকে নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি ছিল। ভারতীয় ভাষায় কথা বলা বা কাজ করা মানুষদের অনেক সময় নিচু চোখে দেখা হতো।”
কোবিন্দের দাবি, মোদি ভারতীয় ভাষা, সংস্কৃতি, প্রতীক ও বিশ্বাসব্যবস্থাকে সামনে নিয়ে এসেছেন এবং এর ফলে মানুষের মধ্যে ভারতীয় পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ বেড়েছে। বিদেশ সফরের সময় প্রবাসী ভারতীয়দের কাছ থেকেও তিনি এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “মোদি বারবার মানসিক ঔপনিবেশিকতার অবসানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ভারত শুধু একটি উদীয়মান বাজার নয়, বরং একটি আত্মবিশ্বাসী নতুন মডেল হিসেবেও উঠে আসছে।”
নিবন্ধের শেষাংশে কোবিন্দ বলেন, স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক দশকের ভারতের সঙ্গে গত ১২ বছরের ভারতের একটি স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তাঁর মতে, নেহরু যুগে পশ্চিমা বিশ্বের স্বীকৃতি ও সমর্থন পাওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল, আর মোদি যুগে আত্মনির্ভর অর্থনীতি ও ভারতীয় সংস্কৃতি, ভাষা এবং মূল্যবোধের প্রতি আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি দৃশ্যমান।
তিনি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন। এক কিশোর আত্মীয় তাঁকে বলেছিল, “আপনি নেহরুর ভারতে বড় হয়েছেন, আর আমি মোদির ভারতে বড় হচ্ছি।” কোবিন্দের দাবি, ওই কিশোর মনে করে তার প্রজন্ম এ কারণে আরও বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
______
























