পাটনা, ২১ অক্টোবর : বিহারের রাজনৈতিক মঞ্চে বিরোধী মহাগঠবন্ধনের মধ্যে প্রবল বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়ের অভাব নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে, যখন ভোটের প্রথম দফার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে পর্যন্তও তারা আসন সমঝোতায় পৌঁছতে ব্যর্থ। এর ফলে অন্তত ১২টি আসনে কংগ্রেস, আরজেডি, সিপিআই ও বিকাশশীল ইনসান পার্টি (ভিআইপি)-র মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে, যা বিরোধী জোটের ঐক্যের প্রশ্নে বড়সড় ধাক্কা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। মূলত দীর্ঘ আলোচনার পরেও মহাগঠবন্ধনের শরিকদের মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। এই পরিস্থিতিকে ঘিরে এনডিএ ও এলজেপি (রামবিলাস) নেতা চিরাগ পাশওয়ান তীব্র কটাক্ষ করেছেন, বলছেন, “এটা বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই নয়, এটা সরাসরি বিভাজন – নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ।”
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আরজেডি এবং কংগ্রেস সরাসরি মুখোমুখি হচ্ছে ছয়টি আসনে— বৈশালি, সিকান্দরা, কাহালগাঁও, সুলতানগঞ্জ, নরকাটিয়াগঞ্জ ও ওয়ারসালিগঞ্জ। একইভাবে, বামদল সিপিআই এবং কংগ্রেস চারটি আসনে পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রার্থী দিয়েছে— বচ্ছোয়ারা, রাজাপাকর, বিহার শরিফ ও করঘর। আর ভিআইপি ও আরজেডির মধ্যে সংঘর্ষ দেখা যাবে চেইনপুর ও বাবুবারহি আসনে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বচ্ছোয়ারা, রাজাপাকর ও বিহার শরিফের মতো আসনগুলোতে ভোট প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, যেখানে মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছে, অর্থাৎ এই আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন চূড়ান্ত। এমনকি দ্বিতীয় দফার ভোটেও যদি ২৩ অক্টোবরের মধ্যে কোনও প্রত্যাহার না হয়, তাহলে বাকি আসনগুলোতেও এই ‘বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই’ অনিবার্য হয়ে উঠবে।
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই আরও একটি হাই-ভোল্টেজ প্রতিদ্বন্দ্বিতা নজর কাড়ছে— মহুয়া আসনে, যেখানে আরজেডির প্রার্থী মুকেশ রৌশনের বিরুদ্ধে লড়ছেন লালু প্রসাদের বড় ছেলে তেজ প্রতাপ যাদব। একসময় আরজেডির প্রভাবশালী নেতা তেজ প্রতাপ, যিনি বর্তমানে নিজের দল জনশক্তি জনতা দল গঠন করে নির্বাচনে নেমেছেন, এবার নিজের পুরনো দলের বিরুদ্ধেই লড়ছেন। পারিবারিক দ্বন্দ্বের এই নাটকীয় উপাখ্যান মহাগঠবন্ধনের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে এলজেপি (রামবিলাস)-র প্রধান চিরাগ পাশওয়ান কটাক্ষ করে বলেন, “আমি জীবনে কখনও দেখিনি যে এত বড় একটি রাজনৈতিক জোট নির্বাচনের মুখে এসেও নিজেদের মধ্যে আসন সংখ্যা নিয়েই স্থির হতে পারছে না। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে প্রার্থী দিচ্ছে, আবার একে বলছে বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই! আসলে এসবের ফলে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র জন্য কঠিন আসনগুলো সহজ হয়ে যাচ্ছে।” চিরাগ আরও বলেন, “যেখানে বিরোধীরা নিজেদের মধ্যে ভোট ভাগ করছে, সেখানে এনডিএ অনেকটাই বাড়তি সুবিধা পাবে। ভোট বিভাজনের এই প্রভাব বহু গুরুত্বপূর্ণ আসনের ফলাফলকে পাল্টে দিতে পারে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও একমত যে, মহাগঠবন্ধনের এই দ্বন্দ্বপূর্ণ লড়াই সরাসরি বিজেপি এবং এনডিএ-কে বাড়তি সুবিধা দেবে। বহু আসনে, যেখানে বিরোধীরা যদি একজোট হয়ে লড়তো, এনডিএ-কে কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বিরোধী ভোট বিভক্ত হওয়ায় সেই প্রতিযোগিতা অনেকটাই সহজ হয়ে যাচ্ছে শাসকজোটের জন্য।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবির এই লড়াইকে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও, রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটা নির্ভর করবে আগামী ২৩ অক্টোবরের পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ ও প্রত্যাহারের ওপর। তবে যেসব আসনে মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা ইতিমধ্যেই শেষ, সেখানে বিরোধী ঐক্যের অভাব অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই।
সবমিলিয়ে, বিহারে মহাগঠবন্ধনের মধ্যে চলা এই অন্তর্কলহ এবং সমন্বয়ের ঘাটতি শুধু বিরোধী শিবিরকে নয়, গোটা নির্বাচনী লড়াইকেই নতুন দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। একদিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অন্যদিকে এনডিএ-র কৌশলগত আক্রমণ— মহাগঠবন্ধনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ঐক্য রক্ষা করে ভোটে টিকে থাকা।

