প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অরুণাচল প্রদেশ সফর: ৫১০০ কোটিরও বেশি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন

ইটানগর, ২২ সেপ্টেম্বর : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আজ অরুণাচল প্রদেশের রাজধানী ইটানগরে এক ঐতিহাসিক সফরে ৫,১০০ কোটিরও বেশি টাকার একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এই উপলক্ষে এক বিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, অরুণাচল প্রদেশ শুধুমাত্র ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং এটি দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও সরলতার এক অপূর্ব উদাহরণ। তিনি অরুণাচলবাসীর উষ্ণ অভ্যর্থনা ও ‘জয় হিন্দ’-এ শুরু হওয়া শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, এই ভূমি যেন জাতীয় পতাকার গেরুয়া রঙের প্রতিচ্ছবি—অগ্রগামী, উৎসাহী ও দেশপ্রেমে ভরপুর। সফরের প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী তাঁর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন—নবরাত্রির শুভ সূচনার দিনে হিমালয় কন্যা মা শৈলপুত্রীর আশীর্বাদ কামনা, দেশে পরবর্তী প্রজন্মের জিএসটি সংস্কারের সূচনা এবং অরুণাচলে বিদ্যুৎ, সংযোগ, স্বাস্থ্য ও পর্যটন খাতে একাধিক প্রকল্পের উদ্বোধন। এই উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী জানান, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ প্রচেষ্টাতেই আজ অরুণাচল এত দ্রুত উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার কটাক্ষ করে বলেন, আগে দিল্লি থেকে যারা দেশ চালাতেন, তারা উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো ছোট জনসংখ্যার এলাকাগুলিকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব না দিয়ে কার্যত অবহেলা করতেন। অথচ, ২০১৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সেই মানসিকতা ভেঙে দিয়ে ‘নেশন ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে প্রশাসনকে শুধু দিল্লিতে সীমাবদ্ধ না রেখে মন্ত্রী ও অফিসারদের উত্তর-পূর্ব সফর বাধ্যতামূলক করেছেন। তিনি জানান, গত ১০ বছরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা ৮০০-রও বেশি বার উত্তর-পূর্ব ভারত সফর করেছেন এবং নিজে তিনি ৭০ বারেরও বেশি এসেছেন এই অঞ্চলে। অরুণাচলের প্রতি এই আন্তরিক দায়বদ্ধতার ফলে আজ এই রাজ্য বাস্তব উন্নয়নের স্বাদ পাচ্ছে। তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে জানান, আগের সরকার যেখানে ১০ বছরে কেন্দ্রীয় কর বাবদ অরুণাচলকে ৬,০০০ কোটি দিয়েছিল, সেখানে তাঁর সরকার সেই অঙ্ক ১৬ গুণ বাড়িয়ে ১ লক্ষ কোটির বেশি করেছে, শুধুমাত্র কর ভাগাভাগি হিসেবেই।

এই সফরে প্রধানমন্ত্রী দুটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—হেও হাইড্রো ইলেকট্রিক (২৪০ মেগাওয়াট) এবং টাটো-I (১৮৬ মেগাওয়াট)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, যেগুলি রাজ্যের শিয়োম উপ-অববাহিকায় নির্মিত হবে এবং প্রায় ৩,৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পন্ন হবে। এই প্রকল্পগুলি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়, কর্মসংস্থান, শিল্পোন্নয়ন ও গ্রামীণ উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তদ্ব্যতীত, তাওয়াং জেলায় ১,২৯০ কোটি ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক কনভেনশন সেন্টারের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী, যা ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সাংস্কৃতিক উৎসব ও প্রদর্শনীর জন্য ব্যবহার হবে এবং পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে যেসব সীমান্তবর্তী গ্রামকে ‘লাস্ট ভিলেজ’ বলে অবজ্ঞা করা হতো, আজ সেগুলিকে ‘ফার্স্ট ভিলেজ’ হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নের মূলস্রোতে যুক্ত করা হয়েছে। ভাইব্রেন্ট ভ্যালেজেস প্রোগ্রাম
-এর অধীনে অরুণাচলের ৪৫০টিরও বেশি সীমান্ত গ্রামে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, রাস্তা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে এখন এই এলাকাগুলি পর্যটনের কেন্দ্র হয়ে উঠছে এবং সেখানে আর আগের মতো মানুষ শহরে চলে যাচ্ছেন না। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সীমান্তে কৌশলগত স্থিতিশীলতার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিও মজবুত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী পর্যটনের প্রসঙ্গে বলেন, গত এক দশকে অরুণাচল প্রদেশে পর্যটকের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে এবং এই প্রবৃদ্ধি আগামী দিনে আরও জোরদার হবে। নতুন কনভেনশন সেন্টার ও উন্নত বিমান যোগাযোগের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণও বাড়বে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে তাঁর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যেই রাজ্যে একাধিক মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়েছে এবং একটি ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের কাজ শুরু হয়েছে। আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের মাধ্যমে বহু মানুষ নিঃশুল্ক চিকিৎসা পাচ্ছেন। নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য ‘লক্ষ্মীপতি দিদি’ প্রকল্পের আওতায় রাজ্যে বহু স্বনির্ভর গোষ্ঠী গঠিত হয়েছে এবং ওয়ার্কিং উইমেন হোস্টেল তৈরি হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রেও রাজ্য এগিয়ে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, কিষান সম্মান নিধি প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার কৃষক উপকৃত হয়েছেন এবং রাজ্যের কমলা, কিউই, এলাচ ও আনারস এখন জাতীয় বাজারে পরিচিতি পাচ্ছে। এই কৃষিপণ্যগুলি রাজ্যের নতুন পরিচয় হয়ে উঠছে।

অর্থনৈতিক সংস্কার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে ২ লক্ষ বার্ষিক আয়েও কর দিতে হত, এখন ১২ লক্ষ পর্যন্ত বার্ষিক আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত করা হয়েছে। জিএসটি সংস্কার করে মাত্র দুটি হার—৫% ও ১৮% রাখা হয়েছে এবং বহু প্রয়োজনীয় পণ্য সম্পূর্ণ করমুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, রান্নার জিনিস, বাচ্চাদের শিক্ষাসামগ্রী, জুতো, কাপড়, বাইক কেনা, রেস্টুরেন্টে খাওয়া—সবই আজ অনেক সস্তা হয়েছে। নতুনভাবে চালু হওয়া “জিএসটি সেভিংস ফেস্টিভ্যাল” এই উপভোক্তা সুবিধা আরও জনপরিসরে তুলে ধরবে এবং জনগণের মাসিক খরচে দৃশ্যমান স্বস্তি আনবে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আত্মনির্ভর ভারতের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “দেশ তখনই উন্নত হবে, যখন দেশ স্বনির্ভর হবে।” তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানান, ‘স্বদেশী’ পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে ও বিদেশি পণ্যের উপর নির্ভরতা কমাতে। তিনি বলেন, “আমাদের যা কিছু কেনা-বেচা হবে, সেটা যেন ভারতের মাটিতে তৈরি হয়—এই প্রতিজ্ঞা আমাদের জাতীয় উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত করবে।” তিনি অরুণাচলের দেশপ্রেমের উদাহরণ টেনে বলেন, “এখানে ‘জয় হিন্দ’ বলা হয় ‘নমস্কার’-এর আগেই। এই মানসিকতা ভারতের ভবিষ্যতের প্রেরণা।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অরুণাচল প্রদেশের রাজ্যপাল লেফটেন্যান্ট জেনারেল কেটি পারনাইক (অবসরপ্রাপ্ত), মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু-সহ একাধিক মন্ত্রী ও আধিকারিক। প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়ে বলেন, “২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে আমরা এগিয়ে চলেছি। এই লক্ষ্য তখনই পূরণ হবে, যখন প্রতিটি রাজ্য, প্রতিটি অঞ্চল, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো দূরবর্তী এলাকাগুলি সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।”

এদিনের সফর অরুণাচল প্রদেশের জন্য যেমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, তেমনই গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়নকেও এক নতুন গতি প্রদান করল বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত।