নয়াদিল্লি, ১৬ সেপ্টেম্বর : ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অব্যাহত মুষলধারে বৃষ্টিপাতের ফলে জনজীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর, পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, মণিপুর সহ বহু রাজ্যে বৃষ্টির তাণ্ডব দেখা দিয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে ধস, সমতল অঞ্চলে জলাবদ্ধতা, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, নদীর পানি বিপদসীমা ছাড়িয়ে যাওয়া ও মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দিল্লি ও গুরগাঁওয়ে সম্প্রতি ভারী বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলগুলো কোমরসমান জলে ডুবে গেছে, যার ফলে যান চলাচল সম্পূর্ণ থমকে যায়। যমুনা নদী একাধিকবার বিপদসীমা অতিক্রম করেছে, যার ফলে পুরো দিল্লি শহরজুড়ে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমনকি লাল কেল্লা সংলগ্ন এলাকাও জলের নিচে চলে যায়। মুম্বইয়ে ধারাবাহিক বৃষ্টির কারণে একাধিক সাবওয়ে, প্রধান সড়ক ও মনোরেল লাইন জলমগ্ন হয়ে পড়ে, ফলে পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। হায়দরাবাদেও একই চিত্র দেখা গেছে—ভারী বৃষ্টিতে রাস্তা প্লাবিত, মানুষ আটকে পড়েছে এবং দুই ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন।
পাহাড়ি রাজ্য হিমাচল প্রদেশে ধস ও বন্যার প্রকোপ চরমে উঠেছে। মান্ডি, শিমলা, কুল্লু সহ একাধিক জেলায় প্রবল বৃষ্টিতে ধস নেমেছে। মান্ডিতে সৌলি খাড় নদী প্লাবিত হয়ে ধৌরমপুর বাস ডিপো সম্পূর্ণ জলের নিচে চলে যায় এবং বাস, গাড়ি ও বাইক জলের তোড়ে ভেসে যায়। শিমলার হিমল্যান্ড এলাকায় ধসের ফলে বহু গাড়ি চাপা পড়ে ও রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যায়। কুল্লু জেলায় সব ধরনের অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস, যেমন রাফটিং ও প্যারাগ্লাইডিং, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মান্ডির নিহরি এলাকায় পাহাড় ধসে একটি বাড়ির ওপর পড়ে, যেখানে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে এবং দুই জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকাজ এখনো চলছে। সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, ২০ জুন থেকে শুরু হওয়া বর্ষা মৌসুমে এখন পর্যন্ত হিমাচল প্রদেশে মোট ৪০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৮০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এখনও পর্যন্ত ৪১ জন নিখোঁজ রয়েছেন এবং রাজ্যে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫০৪ কোটি টাকা।
উত্তরাখণ্ডের দেরাদুন, মুসৌরি ও সাহাস্ত্রধারায় প্রবল রাতভর বৃষ্টির ফলে ধস, ক্লাউডব্রাস্ট এবং সেতু ধসের ঘটনা ঘটেছে। সাহাস্ত্রধারায় ক্লাউডব্রাস্টে বহু দোকান ভেসে যায়, একটি সেতু ধসে পড়ে এবং দুই থেকে তিন জন নিখোঁজ রয়েছেন। মুসৌরিতে একজনের মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। দেরাদুনে টনস নদীর প্রবল স্রোতে এক যুবক বিদ্যুতের খুঁটি আঁকড়ে ধরে নিজের প্রাণ বাঁচায়, পরে বহু ঘণ্টার চেষ্টায় এনডিআরএফ ও পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। জেলা প্রশাসনের তৎপরতায় প্রায় ১০০ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং সব স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী পুশ্কর সিং ধামি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ওপর নজর রাখছেন এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন বলে জানিয়েছেন।
ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাঁচিতেও সোমবার রাতে প্রবল বৃষ্টিতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কান্তা টোলি উড়ালপুলের নিচে দীর্ঘ সময় ধরে জল জমে থাকায় রাস্তার একটি অংশ বসে যায় এবং একটি এসইউভি গাড়ি চলার সময় তার প্রায় ৩০ শতাংশ মাটি ভেঙে পড়ে গাড়ির সঙ্গে গিলে ফেলে। স্থানীয় বাসিন্দারা চালককে উদ্ধার করেন, তবে কেউ আহত হননি। ঘটনা স্থলের পরিস্থিতি দেখে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজৌরি জেলায় নতুন নির্মিত কোটরাঙ্কা-খাওয়াস সড়ক ভারী বৃষ্টিতে ধসে পড়ায় বিগত ১৫ দিন ধরে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই সড়কটি ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে নির্মিত হয়েছিল এবং এটি কোটরাঙ্কা সাবডিভিশন ও খাওয়াস তহসিলকে সংযুক্ত করে। রাস্তা বন্ধ থাকায় ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ, অসুস্থ মানুষদের হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একই সময়ে, এক বাড়ি ৫০ মিটার দূরে সরে যায় ভূমিধসের ফলে, যা দেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুঞ্চ জেলার মেন্ধর এলাকার কালাবান গ্রামে লাগাতার বৃষ্টির কারণে প্রায় ৪০০ জনকে অস্থায়ী ত্রাণ শিবিরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কারণ বহু বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে।
উত্তর-পূর্ব ভারতেও বৃষ্টির প্রকোপ তীব্র। মণিপুরে টানা বৃষ্টিতে ইম্ফল উপত্যকার প্রধান নদীগুলি বিপদসীমার ওপরে বইছে। ইরিল নদীর বাঁধ ভেঙে ইম্ফল ইস্ট জেলার বহু গ্রাম ও ধানক্ষেত প্লাবিত হয়েছে। থৌবাল ও বিষ্ণুপুর জেলাতেও একই অবস্থা। ইথাই ব্যারাজের জলস্তর বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে এবং আশেপাশের গ্রামবাসীদের ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাছ চাষের পুকুর ও কৃষিজমি সম্পূর্ণ ডুবে গেছে। রাজ্যের সব স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ভারতীয় আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আজ উত্তর-পূর্ব ভারত, বিহার, ঝাড়খণ্ড, কনকণ, গোয়া, মধ্য মহারাষ্ট্র, মারাঠওয়াড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড়, পূর্ব উত্তরপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, উত্তর কর্নাটক, রায়লসীমা, তামিলনাড়ু, পুদুচেরি, তেলেঙ্গানা, উত্তরাখণ্ড ও বিদর্ভে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও, জম্মু-কাশ্মীর, লাদাখ, গিলগিট, বালতিস্তান, মুজাফ্ফরাবাদ, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডে বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড় হতে পারে।
প্রশাসন সর্বত্র উদ্ধার ও ত্রাণকার্য চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, পিডব্লিউডি এবং স্থানীয় প্রশাসন মিলিতভাবে উদ্ধার কাজ করছে। বহু অঞ্চলে স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে, রেল ও সড়ক যোগাযোগ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ। সাধারণ মানুষকে সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং আবহাওয়া বিভাগ থেকে নিয়মিত সতর্কতা জারি করা হচ্ছে। এই মৌসুমে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কতটা গভীর তা সময়ই বলবে, তবে দেশের বড় অংশ ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত।

