ঢাকা, ৭ জুলাই : বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নাটকীয় মোড় নেওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের শীর্ষ দুই কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান খান কামাল (সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন (সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক) এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায়।
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১০ জুলাই ২০২৫ তারিখে এ তিনজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন হবে কি না—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে ট্রাইব্যুনালের তিন সদস্যবিশিষ্ট বিচারক প্যানেল। এই শুনানিতে অভিযুক্তদের আইনজীবীরা তাদের যুক্তি তুলে ধরবেন যে, অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন এবং তা খারিজ করা উচিত।
শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে গত ১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগগুলোতে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সারা দেশে চলা গণঅভ্যুত্থানের সময় তারা হত্যাকাণ্ড, হত্যার চেষ্টা, নির্যাতন, জনসাধারণের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগ এবং শক্তিশালী অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অভিযানে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন। এই সময়েই বাংলাদেশে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ৫ আগস্ট সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের একাংশের সমর্থনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় এবং শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন।
অভিযোগ গঠনের আগে গত সপ্তাহেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক ভিন্ন মামলায় শেখ হাসিনাকে আদালত অবমাননার দায়ে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেয়। এই রায় প্রদান করা হয় তার অনুপস্থিতিতে। এটি ছিল তার বিরুদ্ধে আদালতের প্রথম আনুষ্ঠানিক সাজা ঘোষিত ঘটনা।
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তিনি বা তার পরিবারের কেউ এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো বিবৃতি দেননি।
শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়, একইসঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগেও শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল (৬ জুলাই) ঢাকার একটি বিশেষ দুর্নীতি দমন আদালত শেখ হাসিনা, তার সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়, সাইমা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা, এবং রেহানার সন্তানদের বিরুদ্ধে ছয়টি দুর্নীতির মামলায় হাজির হওয়ার জন্য গেজেট নোটিশ জারি করেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম জানান, “আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং আদালত মনে করে তারা আত্মগোপনে রয়েছেন। আগামী ২০ জুলাই পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তারা হাজির না হলে মামলার কার্যক্রম অনুপস্থিতিতেই চলবে।”
এই গেজেটে শেখ হাসিনার সন্তান ও ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য তুলিপ সিদ্দিকের নামও রয়েছে, যিনি ইতোমধ্যে এই বিষয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে কিছু মানবাধিকার ইস্যুতে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানালেও, আওয়ামী লীগ নেতারা এটিকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার’ ফসল বলে অভিহিত করেছেন। একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বিচারের স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার নিশ্চয়তার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
একইসঙ্গে ভারতের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে, যেহেতু শেখ হাসিনা বর্তমানে সেখানে অবস্থান করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারের কাছে তার প্রত্যর্পণ চাওয়া হয়নি।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল সবসময়ই উত্তাল ছিল, কিন্তু এই প্রথম একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, যার ক্ষমতার সময়কাল প্রায় দেড় দশক, তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আসন্ন ১০ জুলাইয়ের শুনানি ও ২০ জুলাই দুর্নীতির মামলার শুনানি দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর, অন্যদিকে দেশের জনগণের কাছে নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়ার দাবি—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করেই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগোতে হবে।



















