আগরতলা, ২ সেপ্টেম্বর: গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ ও কৃষকদের সমৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে অর্গানিক কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে ত্রিপুরা সরকার এবং রাজ্যের কৃষি দপ্তর । এরই ধারাবাহিকতায় রাজ্য থেকে প্রথমবারের মতো মোট ১৮.৭ মেট্রিক টন অর্গানিক পণ্য ইউরোপের বাজারে রপ্তানি করা হল।
বুধবার আগরতলার প্রজ্ঞা ভবনে আয়োজিত ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ফর অর্গানিক প্রোডাকশন-এর সচেতনতা কর্মসূচিতে এই তথ্য জানান কৃষি ও কৃষক কল্যাণমন্ত্রী রতন লাল নাথ।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরার অর্গানিক কৃষি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি রাজ্যের কৃষকদের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। উর্বর মাটি, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের কারণে ত্রিপুরায় জৈব কৃষির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ত্রিপুরার কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরেই ফসলের পর্যায়ক্রমিক চাষ, মিশ্র চাষ এবং জৈব কম্পোস্ট ব্যবহারের মতো পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছেন। নিমভিত্তিক কীটনাশক, গোবর সার এবং জৈবিক উপায়ে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের মতো প্রাকৃতিক পদ্ধতি মাটির উর্বরতা বজায় রাখা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে রাজ্যের একাধিক কৃষক গোষ্ঠী ঐতিহ্যবাহী কৃষি জ্ঞানকে আধুনিক অর্গানিক সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে ত্রিপুরার কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করে বিশ্ববাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অর্গানিক কৃষি শুধুমাত্র একটি কৃষিপদ্ধতি নয়, এটি স্বাস্থ্যকর ও টেকসই ভবিষ্যতের একটি দৃষ্টিভঙ্গি। পরিশ্রমী কৃষক এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ত্রিপুরা দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও জৈব কৃষির উৎকর্ষের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
কৃষি মন্ত্রী জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ত্রিপুরা থেকে বিভিন্ন অর্গানিক কৃষি পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছেছে। কালিখাসা সুগন্ধি চাল, আদা, সুগন্ধি লেবু, বার্ডস আই চিলি এবং জিআই-ট্যাগপ্রাপ্ত কুইন আনারস ইতিমধ্যেই দিল্লি, মহারাষ্ট্র, বেঙ্গালুরু, গুজরাট, পশ্চিমবঙ্গ ও গুয়াহাটির বাজারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি জার্মানি, দুবাই, ওমান এবং বাংলাদেশেও ত্রিপুরার কৃষিপণ্যের বাজার তৈরি হয়েছে।
এদিন আরও একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিথি অর্গানিক ফুডস প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে ১৮.৭ মেট্রিক টন অর্গানিক পণ্য ইউরোপের বাজারে রপ্তানির জন্য পতাকা দেখিয়ে যাত্রা শুরু করান কৃষিমন্ত্রী। রপ্তানিকৃত চালের মধ্যে রয়েছে ১.২ মেট্রিক টন কালিখাসা , ১.৫ মেট্রিক টন স্টিকি রাইস, ৬ মেট্রিক টন ব্ল্যাক রাইস এবং ১০ মেট্রিক টন হরিনারায়ণ চাল।
রতনলাল নাথ বলেন, এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে রাজ্যের কৃষকদের নিষ্ঠা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং বিশ্ববাজারে ত্রিপুরার জৈব কৃষিপণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা। জৈব পদ্ধতিতে সুগন্ধি ও স্টিকি রাইসের পাশাপাশি আদা, হলুদ, বার্ডস আই চিলি, সর্ষে, তিল, ফক্সটেল মিলেট এবং কুইন ও কেও জাতের আনারস চাষেও কৃষকরা এগিয়ে এসেছেন।
মন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকারের সময়ে রাজ্যে মোট ২৬,৬০০ হেক্টর জমি অর্গানিক চাষের আওতায় এসেছে। এর মধ্যে ১৪,৪১১ হেক্টর জমি নিবন্ধিত, ২,০০২ হেক্টর জমি রূপান্তর পর্যায়ে রয়েছে এবং আরও ১০,১৮৯ হেক্টর জমি বিবেচনাধীন। পাশাপাশি কৃষকদের সম্মিলিত শক্তি বৃদ্ধি এবং বাজারের সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত করার লক্ষ্যে রাজ্যে মোট ৫৩টি ফার্মার প্রডিউসার কোম্পানি গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ত্রিপুরা সরকার অর্গানিক কৃষিকে গ্রামীণ সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়েছে। নির্দিষ্ট প্রকল্প, প্রশিক্ষণ এবং সার্টিফিকেশনে সহায়তার মাধ্যমে কৃষকদের উচ্চমূল্যের ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কৃষকদের আরও ক্ষমতায়ন, উৎপাদক সংস্থাগুলিকে শক্তিশালী করা এবং রপ্তানিকারক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান, এপেডা, অভিষেক দেব, আই.এ.এস; ত্রিপুরার কৃষি সচিব, অপূর্ব রায়, আই.এ.এস; এপেডা-র সচিব, ড. সাস্বতী বসু; ত্রিপুরার কৃষি অধিকর্তা, ড. ফণী ভূষণ জামাতিয়া, মিশন ডিরেক্টর, রাজীব দেববর্মা; নাবার্ড-এর জেনারেল ম্যানেজার, তনুশ্রী ভট্টাচার্য; সম্মানিত জৈব কৃষক বৃন্দ, বিভিন্ন এফপিসি-র ম্যানেজিং ডিরেক্টর, দেশ ও বিদেশের প্তানিকারক বৃন্দ, কৃষি কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, কর্মকর্তা, সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন।



















