ধর্মনগর, ৩০ আগস্ট: প্রায় তিন মাস ধরে ত্রিপুরায় পাথর সরবরাহে অচলাবস্থার জেরে চরম সংকটে পড়েছেন পাথর ব্যবসায়ী, ক্রেশার মালিক, গাড়িচালক ও শ্রমিকরা। উত্তর ত্রিপুরার বৃহত্তর ধর্মনগর মহকুমাজুড়ে একের পর এক ছোট-বড় ক্রেশার বন্ধ হওয়ার মুখে। পাথরের জোগান ব্যাহত হওয়ায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও নির্মাণকাজও থমকে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন ব্যবসা, স্থানীয় বাজার ও দোকানপাটেও। পরিস্থিতিতে গোটা মহকুমাজুড়ে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে চুরাইবাড়ি এলাকায় পাথর ব্যবসার উপর নির্ভরশীল অসংখ্য পরিবার বর্তমানে সমস্যায় পড়েছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, এলাকায় পাথর ব্যবসা ছাড়া বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। অনেকেই ব্যাংক ঋণ কিংবা কিস্তিতে গাড়ি কিনে মেঘালয় থেকে বোল্ডার এনে চুরাইবাড়িতে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পাথর পরিবহন বন্ধ থাকায় তাঁদের আয়-রোজগার কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় কয়েকজনের গাড়ি ফাইন্যান্স সংস্থাগুলি নিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে রবিবার ত্রিপুরা বোল্ডার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিলন দেবনাথের বাসভবনে পাথর ব্যবসায়ী, শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি, গাড়ির মালিক, চালক ও ক্রেশার মালিকদের নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, মেঘালয় থেকে বৈধ কাগজপত্রসহ আন্ডারলোড পাথর নিয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশের সময় বরাক উপত্যকার প্রবেশদ্বার দিগরখাল গেটে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও বহু পাথরবোঝাই গাড়ি সেখানে আটকে রাখা হয়েছে বলে দাবি তাঁদের। কেন বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও গাড়িগুলিকে আটকে রাখা হচ্ছে, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, পাথর সরবরাহ বন্ধ থাকায় শুধু পাথর ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, এর প্রভাব পড়ছে রাজ্যের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও। বিভিন্ন নির্মাণকাজে প্রয়োজনীয় পাথরের জোগান না থাকায় প্রকল্পগুলির কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবহন, ক্রেশার, শ্রমিক এবং ছোট-বড় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষের জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বৈঠক থেকে ত্রিপুরা ও অসম সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানানো হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, দিগরখাল গেটের জটিলতা দ্রুত নিরসন করে বৈধ নথিপত্র থাকা পাথরবাহী গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক করতে হবে। সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে পাথর ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হাজার হাজার মানুষ আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
এদিকে অসম থেকে রিভার স্টোন ত্রিপুরায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও পরিবহনকারীরা সমস্যায় পড়ছেন বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। তাঁদের দাবি, বর্ষাকালে নদী থেকে উত্তোলিত পাথরে জল থাকার কারণে গাড়ির ওজন কিছুটা বেড়ে যায়। সেই অতিরিক্ত ওজনকে কেন্দ্র করে চুরাইবাড়ি এমভিআই গেটে একটি গাড়িকে প্রায় ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। অথচ একটি গাড়ি পাথর বিক্রি করে ব্যবসায়ীদের মুনাফা থাকে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টাকা। ফলে এ ধরনের জরিমানার কারণে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ছে বলে দাবি তাঁদের।
ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কা, দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে এর প্রভাব শুধু চুরাইবাড়ি বা ধর্মনগরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, গোটা উত্তর ত্রিপুরা জেলাজুড়ে পড়তে পারে। তাই ত্রিপুরা সরকারকে অসম সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসে দিগরখাল গেটের সমস্যা এবং পাথর পরিবহনের অন্যান্য জটিলতা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বোল্ডার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিলন দেবনাথ, সহ-সভাপতি আব্দুল হাসিম তালুকদার, সম্পাদক রূপক দেবনাথ, সহ-সম্পাদক ছয়াব আলী লস্কর, রাজা ধর, সেলিম মিয়া, ইকবাল হোসেন, বিশ্বজিৎ ঘোষ, সুজেল আহমেদসহ অন্যান্যরা।



















