জয়পুর, ১৪ জুলাই (আইএএনএস): রাজস্থানি ভাষা, লোকসঙ্গীত ও লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং ভীণা ক্যাসেটস-এর প্রতিষ্ঠাতা কে.সি. মালুর প্রয়াণ হয়েছে। সোমবার গভীর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। জয়পুরের নির্মাণ নগরের পার্শ্বনাথ কলোনিতে অবস্থিত তাঁর বাসভবন ‘মালু হাউস’ থেকে শেষযাত্রা শুরু হয়ে পুরানি চুঙ্গি মোক্ষধামে পৌঁছাবে।
১৯৪৬ সালে চুরু জেলার সুজানগড়ে জন্মগ্রহণ করেন কে.সি. মালু। সারাজীবন তিনি রাজস্থানের সমৃদ্ধ ভাষা, লোকসংস্কৃতি ও সঙ্গীত ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারে কাজ করে গেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ভীণা ক্যাসেটস-এর মাধ্যমে হাজার হাজার রাজস্থানি লোকগান, ভক্তিগীতি ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা রেকর্ড ও প্রকাশিত হয়। এর ফলে রাজস্থানের সঙ্গীত ঐতিহ্য যেমন সংরক্ষিত হয়েছে, তেমনই বহু নবীন শিল্পীও পরিচিতি পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
রাজস্থানি ভাষাকে ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্দোলনেরও অন্যতম সক্রিয় মুখ ছিলেন তিনি। এই দাবিতে প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছিলেন।
১৯৮৭ সালে রাজস্থানের ভয়াবহ খরার সময় তাঁর উদ্যোগে জয়পুরে ঐতিহাসিক ‘লতা মঙ্গেশকর নাইট’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১.০১ কোটি টাকা ত্রাণ তহবিলে সংগ্রহ হয়। কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকর বিনা পারিশ্রমিকে গান পরিবেশন করেছিলেন। এছাড়াও মহম্মদ আজিজ, নীতিন মুকেশ ও উষা মঙ্গেশকরও ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য কে.সি. মালু ‘সমগ্র কলা সাধনা পুরস্কার’, ‘ডাগর ঘরানা পুরস্কার’-সহ একাধিক সম্মানে ভূষিত হন। রাজস্থানের ভাষা, লোকসঙ্গীত ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাজস্থান সরকার তাঁকে ‘রাজস্থান রত্ন’ সম্মানেও ভূষিত করে।
তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন গ্র্যামিজয়ী সঙ্গীতশিল্পী বিশ্বমোহন ভাট, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট, বিজেপির রাজ্য সভাপতি মদন রাঠোর, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। বিশ্বমোহন ভাট বলেন, লোকসঙ্গীতের এমন নিবেদিতপ্রাণ পৃষ্ঠপোষকের অবদান আগামী বহু প্রজন্ম স্মরণ করবে। অশোক গেহলটও জানান, মাত্র এক সপ্তাহ আগেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল এবং রাজস্থানি সঙ্গীতকে দেশ-বিদেশে পরিচিত করে তুলতে মালুর অবদান অনন্য।
বিধায়ক গোপাল শর্মা বলেন, সরকারি সহায়তা ছাড়াই সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য কে.সি. মালুর আজীবন কাজ নিঃস্বার্থ সেবার বিরল উদাহরণ। তিনি রাজস্থানের ঐতিহ্যবাহী বিয়ের ২২১টি লোকগান নিয়ে দুটি বিশদ সংকলন প্রকাশ করেন, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নথিভুক্ত বিবাহ-লোকগানের সংগ্রহ হিসেবে বিবেচিত হয়। হিন্দি, ইংরেজি ও রাজস্থানি ভাষায় প্রকাশিত এই সংকলন ২৪টি অডিও-ভিডিও সিডির মাধ্যমেও সংরক্ষিত হয়েছে।
জীবদ্দশায় তিনি ৫,০০০-এরও বেশি রাজস্থানি লোকগানের পাণ্ডুলিপি ও অডিও সংরক্ষণ করেন। ‘ঘুমর’, ‘চিরমি’ ও ‘কাঙ্গাসিয়ো’-র মতো জনপ্রিয় লোকসঙ্গীতের অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি রাজস্থানের লোকঐতিহ্যকে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। এছাড়া তিনি ‘সুর-সঙ্গম’ নামে দেশীয় সঙ্গীতচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং ‘ভীণা মিউজিক’-কে রাজস্থানি লোকসঙ্গীতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে পরিণত করেন।
প্রখ্যাত সুরকার নৌশাদের সঙ্গে কাজ করে তিনি রাজস্থানি লোকসঙ্গীতকে সর্বভারতীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজস্থানের ভাষা, সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্য রক্ষায় তাঁর আজীবনের অবদান আগামী প্রজন্মের শিল্পী, গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করে যাবে।



















