ঢাকা, ২৮ জুন (আইএএনএস): সংবিধানে শিক্ষাকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব এবং সামাজিক প্রয়োজন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, সমতাভিত্তিক ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে সরকারকে আইনি জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ বাংলাদেশের নাগরিকদের খুবই সীমিত। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো-তে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে এই দাবি করা হয়েছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস (সিপিজে)-এর নির্বাহী পরিচালক শাহরিয়ার সাদাত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সেস প্রোগ্রাম-এর প্রধান প্রান্তিক চৌধুরী যৌথভাবে নিবন্ধটি লিখেছেন।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধান ও শিক্ষা নীতিতে অগ্রসর চিন্তাভাবনা থাকলেও বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থার বড় ফারাক রয়ে গেছে।
লেখকদের দাবি, “বাংলাদেশে ১২ বছরের স্কুলশিক্ষা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাত্র সাত বছরের শিক্ষার সমতুল্য। অভিভাবকেরা আশা নিয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠান, কিন্তু বাস্তবে তারা বড় ধরনের শিক্ষাগত ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নীতি ও সংবিধানে সমতা, অন্তর্ভুক্তি এবং মানসম্মত শিক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে শিক্ষার গুণগত উন্নতির বদলে সংখ্যাগত বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য, শ্রেণিভেদ এবং অসম ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে।
লেখকদের মতে, এই বৈপরীত্যের সূত্রপাত সংবিধানের মধ্যেই রয়েছে।
তাঁরা উল্লেখ করেছেন, সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে সর্বজনীন, গণমুখী এবং অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলা হলেও, শিক্ষাকে মৌলিক অধিকারের পরিবর্তে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।
ফলে শিক্ষাকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, নাগরিকদের পক্ষে সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না করার জন্য সরকারকে আইনি ভাবে জবাবদিহি করানো কঠিন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া, সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে সুযোগের সমতা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর কথা বলা হলেও, সংবিধান প্রণয়নের ১৮ বছর পরে ১৯৯০ সালে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন কার্যকর হয় বলে লেখকরা উল্লেখ করেছেন।
২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার সুপারিশ করা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি বলেও নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে। বর্তমানে কার্যত পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্তই বাধ্যতামূলক শিক্ষা সীমাবদ্ধ থাকায় দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।
ইউনেস্কোর তথ্য উদ্ধৃত করে লেখকরা জানান, বিশ্বের ১৫৫টি দেশে প্রাক-প্রাথমিক থেকে অন্তত নিম্ন মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক। শ্রীলঙ্কা, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান এবং মালদ্বীপও বাংলাদেশের তুলনায় বাধ্যতামূলক শিক্ষার পরিধি বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা ধারায় ছাত্রভর্তির প্রবণতারও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে পাঠ্যক্রমের সামঞ্জস্য বাড়ায় আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তির হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে কম খরচ, খাদ্য, আবাসন ও তদারকির সুবিধার কারণে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলির কাছে কওমি মাদ্রাসা আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
২০২৪ সালে বণিক বার্তা-র একটি প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের প্রায় ৩৮.০৬ লক্ষ থেকে ২০২২ সালে আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রসংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪০.২ লক্ষে পৌঁছেছে। একই সময়ে কওমি মাদ্রাসাতেও প্রায় এক লক্ষ নতুন শিক্ষার্থী যুক্ত হয়েছে।
লেখকদের মতে, এর ফলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পাচ্ছেন, শহুরে মধ্যবিত্তের বড় অংশ জাতীয় শিক্ষাক্রমের উপর নির্ভরশীল, আর দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বহু শিক্ষার্থী সীমিত সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুল বা মাদ্রাসার উপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।



















