নয়াদিল্লি, ১৮ জুন (আইএএনএস): গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-র মদতে পরিচালিত একাধিক জঙ্গি-যোগযুক্ত আন্ডারওয়ার্ল্ড মডিউলের হদিস পেয়েছে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। তদন্তে কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিম, শাহজাদ ভাট্টি এবং আজমল গুজ্জরের নাম উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিয়োগ করা বেশ কয়েকজন যুবককে গ্রেফতারের পর এই তথ্য সামনে আসে।
প্রাথমিক তদন্তে দিল্লি ও মুম্বইয়ে হামলার পরিকল্পনার ইঙ্গিত মিললেও, গোয়েন্দা সংস্থাগুলির এখন ধারণা, এই মডিউলগুলির আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল নিরাপত্তা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করা এবং জম্মু ও কাশ্মীরে বড়সড় জঙ্গি হামলার প্রস্তুতি আড়াল করা।
ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) এক শীর্ষ আধিকারিকের মতে, মূল লক্ষ্য ছিল জম্মু ও কাশ্মীরে বড় ধরনের হামলা চালানো। তাঁর দাবি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক মডিউল গড়ে তোলা হয়েছে, যার কিছু হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে ভুল পথে পরিচালিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “আন্ডারওয়ার্ল্ড দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এর মধ্যে কিছু মডিউলের উদ্দেশ্য হতে পারে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা এবং সম্ভাব্য কাশ্মীর হামলা থেকে নজর সরিয়ে রাখা।”
তদন্তে জানা গিয়েছে, এই নেটওয়ার্কগুলি মূলত মোবাইল ফোন মেরামতকারী, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ এবং সিসিটিভি প্রযুক্তিতে দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ করছিল। প্রথমে ফরিদাবাদে সক্রিয় একটি মডিউলের সন্ধান মেলে। তদন্তকারীরা দেখতে পান, ওই গোষ্ঠীর সদস্যরা সংবেদনশীল ও জনবহুল এলাকায় সৌরশক্তিচালিত সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছিল।
প্রথমদিকে মনে করা হয়েছিল, দিল্লি ও মুম্বইয়ে হামলার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু তদন্ত এগোতে থাকায় জম্মু ও কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, আইএসআই পুলওয়ামা ও পহেলগাঁওয়ের মতো হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা করছিল।
এক আধিকারিক জানান, “এবারের কৌশল ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। নিয়োগপ্রাপ্ত সবাই ভারতীয় নাগরিক এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ধর্ম কোনও বিষয় ছিল না।”
তদন্তকারীদের মতে, আইএসআই এমন একটি হামলার ছক কষেছিল যেখানে ভারতীয় নাগরিকদেরই মূল কার্যকরী বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, নিয়োগের ক্ষেত্রে জম্মু ও কাশ্মীরের স্থানীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি।
তাঁদের মতে, “কাশ্মীরের স্থানীয়দের নিয়োগ করা হলে দ্রুত সন্দেহ তৈরি হতো এবং গোটা নেটওয়ার্ক ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ত।”
নিরাপত্তা সূত্রে জানানো হয়েছে, পহেলগাঁও হামলা এবং ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর পর জম্মু ও কাশ্মীরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্কতার স্তরে রয়েছে। ওই অভিযানে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী লস্কর-ই-তইবা এবং জইশ-ই-মহম্মদের সঙ্গে যুক্ত একাধিক জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করেছিল।
গোয়েন্দা আধিকারিকদের মতে, আইএসআই এখনও কাশ্মীরে নতুন জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বা পুরনো নেটওয়ার্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে বর্তমানে তা অনেক বেশি গোপনীয়তার সঙ্গে করা হচ্ছে।
তাঁদের দাবি, বালুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া এবং পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে অস্থিরতার কারণে পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ চাপে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কাশ্মীর ইস্যুকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জীবিত রাখার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ।
আরেক গোয়েন্দা আধিকারিকের মতে, শাহজাদ ভাট্টি ও দাউদ ইব্রাহিমের মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে যুক্ত আরও মডিউল সামনে আসতে পারে। এসব নেটওয়ার্ক দেশের বিভিন্ন শহরে হামলার সক্ষমতা গড়ে তুলতে কাজ করছে বলে অভিযোগ।
ফরিদাবাদ মডিউলের তদন্তে আরও জানা যায়, সদস্যরা দিল্লি থেকে জম্মু যাওয়ার রেলপথের বিভিন্ন স্টেশনে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা করেছিল, যাতে সেনাবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যায়।
তদন্তকারীদের দাবি, এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা পুলওয়ামাতেও গিয়েছিল এবং সেখানে সংগ্রহ করা সংবেদনশীল তথ্য পাকিস্তানে অবস্থানকারী হ্যান্ডলারদের কাছে পাঠিয়েছিল।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলির মতে, এসব তথ্য প্রমাণ করে যে মডিউলটির মূল কাজ ছিল কাশ্মীরে বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা, যাতে পুলওয়ামা বা পহেলগাঁওয়ের ধাঁচে বড়সড় হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।



















