নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১৩ জুন: গত এক দশকেরও বেশি সময়ে আগরতলার মহারাজা বীর বিক্রম (এমবিবি) বিমানবন্দর অভূতপূর্ব উন্নয়নের সাক্ষী হয়েছে। সীমিত পরিসরের একটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর থেকে বর্তমানে এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমান যোগাযোগ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন এমবিবি বিমানবন্দরের অধিকর্তা কৃষাণ মোহন নেহরা।
শনিবার ‘যাত্রী সুবিধা দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিমানবন্দরের সার্বিক উন্নয়ন, যাত্রী পরিষেবার সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
বিমানবন্দর অধিকর্তা জানান, ২০১৪ সালে আগরতলা বিমানবন্দরের বিমান পরিষেবা মূলত কলকাতা ও গৌহাটি-কেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু গত বারো বছরে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫টি বিমান ওঠানামা করছে। আগরতলা থেকে এখন সরাসরি দিল্লি, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, চেন্নাই, আহমেদাবাদ, ইম্ফল, কলকাতা ও গৌহাটিসহ দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিমান পরিষেবা চালু রয়েছে।
তিনি জানান, ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে বিমানবন্দরটির বার্ষিক যাত্রী সংখ্যা ছিল প্রায় ৮.৯ লক্ষ। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৫ লক্ষে পৌঁছেছে। একইভাবে বার্ষিক বিমান চলাচলের সংখ্যা ৭ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ১২ হাজারে উন্নীত হয়েছে, যা বিমানবন্দরের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরই প্রতিফলন।
কৃষাণ মোহন নেহরা বলেন, রাজ্যের অর্থনৈতিক বিকাশে বিমানবন্দরের অবদান আরও শক্তিশালী করতে ২০২৫ সালে একটি আধুনিক ডোমেস্টিক এয়ার কার্গো টার্মিনাল চালু করা হয়েছে। বছরে ৪০ হাজার টন পণ্য পরিবহনের সক্ষমতাসম্পন্ন এই টার্মিনাল রাজ্যের কৃষিজ পণ্য, হস্তশিল্প, ওষুধ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক সামগ্রী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দ্রুত পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
যাত্রী পরিষেবার উন্নয়নের বিষয়েও একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে বিমানবন্দরে ডিজি যাত্রা ব্যবস্থা, সেলফ-চেক-ইন কিয়স্ক, বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই, উদান যাত্রী ক্যাফে, শিশু পরিচর্যা কক্ষ, ম্যাসাজ চেয়ার এবং স্থানীয় শিল্প ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য বিশেষ প্রদর্শনী স্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি যাত্রীদের আরও বেশি সংখ্যায় ডিজি যাত্রা পরিষেবা ব্যবহারের আহ্বান জানান।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারেও এমবিবি বিমানবন্দর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। নেহরা জানান, বিমানবন্দরে ইতোমধ্যে ২৫০ কিলোওয়াট ও ৬০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে আরও ১,৬০০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় ২১ লক্ষ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে এবং বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ২ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, নতুন সমন্বিত টার্মিনাল ভবন, আধুনিক প্যাসেঞ্জার বোর্ডিং ব্রিজ, অতিরিক্ত ট্যাক্সিওয়ে এবং অত্যাধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থার সংযোজনের ফলে বিমানবন্দরের কার্যক্ষমতা, যাত্রীসুবিধা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় এবং ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ত্রিপুরায় সংঘটিত ভয়াবহ বন্যার সময় এমবিবি বিমানবন্দর ত্রাণ সামগ্রী পরিবহন, জরুরি পরিষেবা পরিচালনা এবং উদ্ধার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলেও উল্লেখ করেন বিমানবন্দর অধিকর্তা।
সাংবাদিক সম্মেলনে কৃষাণ মোহন নেহরা বলেন, “মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দর আজ শুধুমাত্র একটি বিমান পরিবহন কেন্দ্র নয়। এটি ত্রিপুরার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী বছরগুলিতে আরও উন্নত অবকাঠামো, নতুন গন্তব্যে বিমান পরিষেবা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজনের মাধ্যমে এমবিবি বিমানবন্দর উত্তর-পূর্ব ভারতের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


















