আহমেদাবাদ, ১২ জুন (আইএএনএস) : আহমেদাবাদের ভয়াবহ এয়ার ইন্ডিয়া বিমান দুর্ঘটনার প্রথম বর্ষপূর্তিতে সেই দুঃসহ দিনের স্মৃতি তুলে ধরলেন হাসপাতাল ও পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাঁদের বর্ণনায় উঠে এসেছে টানা ৭২ ঘণ্টার উদ্ধার ও নিরাপত্তা অভিযান, পাশাপাশি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মৃতদের শনাক্ত করতে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা নিরলস প্রচেষ্টার কথা।
গত বছরের ১২ জুন লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-১৭১ ফ্লাইটটি আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই পটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘানিনগর এলাকায় ভেঙে পড়ে। বিমানটি বি. জে. মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেল ও মেস ভবনে আছড়ে পড়ায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়।
বিমানে থাকা ২৪২ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্যের মধ্যে মাত্র একজন প্রাণে বেঁচে যান। ভূমিতে থাকা আরও কয়েকজনের মৃত্যু হওয়ায় মোট মৃতের সংখ্যা প্রায় ২৬০-এ পৌঁছায়।
আহমেদাবাদ সিভিল হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. রাকেশ যোশী জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি অপারেশন থিয়েটারে দীর্ঘ অস্ত্রোপচারে ব্যস্ত ছিলেন। দুপুর প্রায় ১টা ৪০ মিনিটে তিনি প্রথমে ঘন ধোঁয়ার খবর পান। পরে নিশ্চিত হওয়া যায় যে একটি আন্তর্জাতিক বিমান মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে ভেঙে পড়েছে।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। সার্জন, অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ, নিউরোসার্জন, জরুরি বিভাগের চিকিৎসকসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মীদের নিয়ে বিশেষ দল গঠন করা হয়।
প্রথম দিকে আহতদের হাসপাতালে আনা হলেও প্রায় এক ঘণ্টা পর থেকে আসতে শুরু করে আগুনে পুড়ে যাওয়া ও বিকৃত মৃতদেহ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিচয় নির্ধারণ সম্ভব না হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার ওপর নির্ভর করতে হয়।
ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. ধর্মেন্দ্র প্যাটেলের তত্ত্বাবধানে মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। একইসঙ্গে নিহতদের আত্মীয়দের কাছ থেকেও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়, যাতে দ্রুত মিলিয়ে দেখা যায়।
ডা. যোশী জানান, দুর্ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই প্রথম ডিএনএ মিল পাওয়া যায়। এরপর ধাপে ধাপে মৃতদেহ শনাক্ত করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ দিন সময় লেগেছিল।
তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ২৫৪ জনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এবং আরও ৬ জনের পরিচয় মুখমণ্ডল দেখে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।
অন্যদিকে, দুর্ঘটনার পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা উদ্ধারস্থলের দায়িত্বে থাকা জয়েন্ট পুলিশ কমিশনার নীরজ বুদগুজর জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁদের প্রধান দায়িত্ব ছিল এলাকা ঘিরে ফেলা এবং কোনও অননুমোদিত ব্যক্তিকে প্রবেশ করতে না দেওয়া।
তিনি বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ চলার পাশাপাশি নিহতদের দেহ উদ্ধার করা হচ্ছিল। যাত্রীদের পাসপোর্ট, গয়না, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী নিরাপদে সংরক্ষণ এবং বিমানের ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার করাও ছিল অগ্রাধিকার।
পুলিশ, সিআরসিএফ, সেনাবাহিনী, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থা একযোগে কাজ করে পরিস্থিতি সামাল দেয়। দুর্ঘটনাস্থলে প্রচণ্ড তাপ, ধোঁয়া ও পোড়া দেহের তীব্র গন্ধের মধ্যেও পুলিশ সদস্যরা দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন।
বুদগুজর জানান, অনেক পুলিশকর্মী টানা ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেছেন। দুর্ঘটনাস্থল, হাসপাতাল ও ময়নাতদন্ত কেন্দ্রগুলিতে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করা হয়।
প্রথম বর্ষপূর্তিতে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, এটি ছিল শহরের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম জরুরি পরিস্থিতি, যেখানে হাসপাতাল, পুলিশ, ফরেনসিক বিভাগ, পুরসভা, বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারী সংস্থা এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দিনরাত এক করে কাজ করেছে।
তাঁদের মতে, এই দুর্ঘটনা শুধু একটি বিমান বিপর্যয় ছিল না, বরং মানবিক, প্রশাসনিক এবং বৈজ্ঞানিক সমন্বয়ের এক বিরাট পরীক্ষা, যার প্রভাব আজও বহু পরিবার বয়ে বেড়াচ্ছে।



















