ওয়াশিংটন, ৩০ মে (আইএএনএস): প্রায় আট বছরের গবেষণা ও পরিকল্পনার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে তুলে ধরতে একটি স্থায়ী জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের একটি সংগঠন। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের নাম ইন্ডিয়া হেরিটেজ সেন্টার।
এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভারতীয়-মার্কিন শিক্ষাবিদ ও সমাজনেতা অমিতাভ শর্মা। তাঁর দাবি, এটি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের ১১ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রথম নিবেদিতপ্রাণ জাদুঘর হবে।
শর্মা আইএএনএস-কে বলেন, “ভারতের ইতিহাস ও সভ্যতাকে কখনও তার প্রাপ্য মর্যাদায় বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হয়নি। আজকের সময়ে বিশ্বের কাছে আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ইতিহাস ও অবদানের প্রকৃত কাহিনি তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
আটলান্টাভিত্তিক শর্মার মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সভ্যতার ইতিহাস বাইরের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা খণ্ডিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সেই কারণেই একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে ভারতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য বিবরণ বিশ্বের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত জাদুঘরটি প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে নির্মিত হবে। সেখানে ১০টি পৃথক গ্যালারি, ৩৫০ আসনবিশিষ্ট অডিটোরিয়াম, গ্রন্থাগার, অভ্যর্থনা কেন্দ্র এবং উপহার সামগ্রীর দোকান থাকবে।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি, অগমেন্টেড রিয়্যালিটি, ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রদর্শনী, আধুনিক অডিও-ভিডিও প্রযুক্তি, মুরাল ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে ভারতের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরা হবে।
শর্মা জানান, জাদুঘরের গ্যালারিগুলিতে খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০০ সাল থেকে শুরু করে ভারতের সভ্যতার বিকাশ, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সাফল্য, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক অর্জন, প্রতিকূল সময়ের মোকাবিলা এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের উত্থানের কাহিনি তুলে ধরা হবে।
প্রস্তাবিত প্রদর্শনীগুলির মধ্যে থাকবে সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতা, বৈদিক ঐতিহ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, যোগ ও আয়ুর্বেদ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং আধুনিক ভারতের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিভিন্ন অধ্যায়।
শর্মার মতে, এই জাদুঘর শুধু ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের জন্য নয়, বরং মার্কিন নাগরিক এবং অন্যান্য জাতিগত সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছেও ভারতের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে পরিচিত করে তুলবে।
তিনি বলেন, “আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনেকেই প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে খুব কম জানে। তাই আমরা শুধু ভারতীয় সম্প্রদায়ের জন্য নয়, বহুজাতিক সমাজের কাছেও ভারতের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে চাই।”
জাদুঘরে ভারতের সহাবস্থান ও বহুত্ববাদের ঐতিহ্যের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
শর্মা বলেন, “আমরা বিশ্বকে জানাতে চাই যে ভারত বরাবরই নিপীড়িত সম্প্রদায়গুলিকে আশ্রয় দিয়েছে। এটি এমন এক সভ্যতা, যা শান্তি ও সহাবস্থানকে সর্বদা মূল্য দিয়েছে।”
জাদুঘরের জন্য ওয়াশিংটন ডিসিকেই সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিপুল সংখ্যক পর্যটক এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বের কারণে এই শহরকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, ইতিমধ্যেই উপযুক্ত জমি বা স্থান চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে এবং এই লক্ষ্যে একটি সক্রিয় প্রচারাভিযানও চলছে।
প্রকল্পের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে জাদুঘরের উপস্থাপিত তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে।
একটি অলাভজনক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত ইন্ডিয়া হেরিটেজ সেন্টার-এর মোট প্রকল্প ব্যয় ১ কোটি ২০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৪০ লক্ষ মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তহবিল সংগ্রহের জন্য ধনী ব্যক্তিদের অনুদান, কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা, অনুদান প্রকল্প, ক্রাউডফান্ডিং এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করা হবে।
শর্মা বলেন, “এটি কোনও এক ব্যক্তির প্রকল্প নয়, এটি সমগ্র ভারতীয় সম্প্রদায়ের প্রকল্প।”
তিনি জানান, সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, “এতদিন আগে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কেন?”
উল্লেখ্য, বর্তমানে ভারতীয়-মার্কিন সম্প্রদায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী অভিবাসী গোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ব্যবসা, প্রযুক্তি, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে ভারতের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরার উদ্যোগও সম্প্রদায়ের মধ্যে বাড়ছে।
যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তবে ওয়াশিংটনের সমৃদ্ধ জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ভারতের প্রাচীন ও ধারাবাহিক সভ্যতার প্রতিনিধিত্বকারী একটি স্থায়ী কেন্দ্র যুক্ত হবে।
________



















