নয়াদিল্লি, ১১ মে: সিপিআই(এম) পলিটব্যুরোর দু’দিনের বৈঠক শেষে সোমবার প্রকাশিত বিবৃতিতে কেরলে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের (এলডিএফ) পরাজয়কে “গুরুতর ধাক্কা” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দল জানিয়েছে, এই পরাজয়ের কারণ খতিয়ে দেখতে গভীর পর্যালোচনা চালানো হবে। ১০ ও ১১ মে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত পলিটব্যুরো বৈঠকে অসম, কেরল, পুদুচেরি, তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, টানা দশ বছর ক্ষমতায় থাকার পর কেরলে এলডিএফের পরাজয় এবং প্রথমবার বিজেপির তিনটি আসনে জয় “গুরুতর হুমকি” তৈরি করেছে। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ ও অপপ্রচার চালানোর পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি “নরম মনোভাব” দেখানোর অভিযোগও তোলে সিপিআই(এম)। দলের মতে, এর ফলেই কেরলে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে পরাজয়ের পরেও এলডিএফ ৩৭.৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে উল্লেখ করে পলিটব্যুরো জানিয়েছে, মানুষের মধ্যে এখনও বামপন্থীদের সমর্থন রয়েছে। কেরলের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষায় এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দল সামনের সারিতে থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।
দল জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই প্রাথমিক পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী দিনে আরও গভীর বিশ্লেষণ করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় দলের সদস্য, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের মতামতও গুরুত্ব পাবে। প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সাংগঠনিক পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ প্রসঙ্গে পলিটব্যুরো দাবি করেছে, বিজেপির জয় “সাম্প্রদায়িক, বিভাজনমূলক এবং ঘৃণার রাজনীতি”, বিপুল অর্থব্যয় এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এবং এসআইআর প্রক্রিয়ারও অপব্যবহারের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
সিপিআই(এম)-এর অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে জনবিরোধী মনোভাব ও দুর্নীতির সুযোগও বিজেপি কাজে লাগিয়েছে। পাশাপাশি অসমে বিজেপির বাড়তি সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং পুদুচেরিতে এনআর কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের জয়কে “হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থান” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
তামিলনাড়ু প্রসঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিজেপি এবং তার মিত্ররা রাজ্যপালের দফতরকে ব্যবহার করে সি জোসেফ বিজয়-এর নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ করাতে বাধ্য হন রাজ্যপাল।
সিপিআই(এম), সিপিআই এবং ভিসিকে টিভিকে-নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন করেছে বলে জানানো হয়েছে। নতুন সরকারের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে মানুষের প্রত্যাশা পূরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মিতব্যয়িতার আহ্বানেরও তীব্র সমালোচনা করেছে পলিটব্যুরো। বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল জোটের পাশে দাঁড়ানোর ফলেই ভারত বর্তমান পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে হামলার নিন্দা না করা এবং হরমুজ প্রণালীতে অবাধ চলাচলের দাবিতে উদ্যোগ না নেওয়ার জন্য কেন্দ্রের সমালোচনা করা হয়েছে।
সার ও কৃষিক্ষেত্রের সংকটের আশঙ্কা তুলে পলিটব্যুরো জানিয়েছে, অবিলম্বে কৃষকদের সার সরবরাহ নিশ্চিত না করলে খাদ্য উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
শ্রম আইন নিয়েও কেন্দ্রকে আক্রমণ করেছে সিপিআই(এম)। দলের অভিযোগ, বিধানসভা নির্বাচনের আগে শ্রম কোড কার্যকর না করে ফল ঘোষণার চার দিনের মধ্যে তা চালু করা হয়েছে, যা বিজেপি সরকারের “প্রতারণামূলক কৌশল”-এর উদাহরণ।
পলিটব্যুরো শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে উত্তরপ্রদেশ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রসঙ্গে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম “লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি” দেখিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে, যদিও তাঁরা প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়া নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
সিপিআই(এম)-এর অভিযোগ, আরএসএস-বিজেপি রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের চেষ্টা করছে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে এক নির্বাচনী পর্যবেক্ষকের নিয়োগকে তার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে কিউবার প্রতি সংহতি প্রকাশ করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকির নিন্দাও করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান ও কিউবা প্রশ্নে ভারত সরকারের “নতজানু বিদেশনীতি”-র সমালোচনা করা হয়েছে।
শেষে জানানো হয়েছে, আগামী ২২ থেকে ২৪ মে দিল্লিতে সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এবং দেশের দ্রুত পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।



















