নয়াদিল্লি, ৩ মার্চ (আইএএনএস): ভারতের বিভিন্ন মাদক মামলার তদন্তে, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতজুড়ে, ক্রমশ থাইল্যান্ড থেকে পরিচালিত চক্রগুলির যোগসূত্র সামনে আসছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, থাইল্যান্ডে বসে একাধিক কার্টেল ভারতের বিভিন্ন অংশে সক্রিয়ভাবে ব্যবসা চালাচ্ছে এবং গত কয়েক বছরে দক্ষিণ ভারতে তাদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তদন্তকারী সংস্থাগুলির দাবি, এই কার্টেলগুলি সবসময় স্থানীয়দের দ্বারা পরিচালিত নয়। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, থাইল্যান্ডে বসেই ভারতীয় মাদকচক্রের মূল হোতারা সরাসরি অপারেশন পরিচালনা করছেন।
বেঙ্গালুরু পুলিশের অধীন সেন্ট্রাল ক্রাইম ব্রাঞ্চ (সিসিবি)-এর নারকোটিক্স কন্ট্রোল উইং সম্প্রতি দুই আন্তঃরাজ্য মাদক পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করে একটি চক্র ভেঙে দেয়। ধৃতদের নাম অশ্বিন ও মুবিনা। পুলিশের দাবি, তারা কর্ণাটকে এলএসডি স্ট্রিপ ও চরস বিক্রি করছিল।
ধৃত দুই ব্যক্তি কেরল থেকে এসে প্রায় এক বছর ধরে কর্ণাটকে বসবাস করছিল এবং থাইল্যান্ডে অবস্থানরত মূল হোতাদের নির্দেশে বেআইনি মাদক সরবরাহ চক্র সংগঠিত করছিল। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, থাইল্যান্ডে থাকা কেরল-ভিত্তিক এক অপারেটিভের মাধ্যমে তারা মাদক সংগ্রহ করত এবং পরে তা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিত।
এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, কয়েক বছর আগে পাঞ্জাবে মাদক সমস্যা চরমে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরে কেরলে মাদক বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে কেরলে এনডিপিএস আইনের অধীনে ২৭,৭০০-রও বেশি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে পাঞ্জাবের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেশি।
তদন্তকারীদের মতে, পাকিস্তান-ভিত্তিক অপারেটিভরা মূলত উত্তর ভারতে সক্রিয় থাকলেও মেক্সিকো, চীন ও থাইল্যান্ড-ভিত্তিক কার্টেলগুলি দক্ষিণ ভারতে বেশি সক্রিয়। তামিলনাড়ু ও কেরল থাইল্যান্ড-সহ বিভিন্ন দেশ থেকে মাদক পাচারের অন্যতম ‘হটস্পট’ হয়ে উঠেছে।
মেক্সিকো থেকে চীনা কার্টেলের সহায়তায় এবং মায়ানমারের নাগরিকদের মাধ্যমে যে মাদক ভারতে আসে, তার মধ্যে মেথামফেটামিন থাকে—যার দক্ষিণ ভারতে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানো বড় অংশের চালান সেখান থেকে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে পাঠানো হয়, পরে তা দেশের অন্যান্য অংশ এবং এমনকি মায়ানমারেও পাচার হয়।
থাইল্যান্ড থেকে মূলত এলএসডি, চরস ও কোকেন ভারতে আসে। ৫৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা থাকায় কেরলকে থাই কার্টেলগুলি ভারতের অপারেশনের প্রধান ‘ল্যান্ডিং পয়েন্ট’ হিসেবে বেছে নিয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি। কেরল হয়ে এই মাদক তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকে পৌঁছয়।
দক্ষিণের বাজারে প্রভাব বিস্তার করার পাশাপাশি মহারাষ্ট্রেও এই চক্রগুলি সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। পুনেতে এমনই একটি আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রের সন্ধান পায় পুলিশ, যা থাইল্যান্ড ও ভুটান থেকে পরিচালিত হচ্ছিল। পাঁচ জনকে গ্রেপ্তারের পর জানা যায়, তারা ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে হাওয়ালা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করত।
তদন্তে আরও জানা গেছে, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে এলএসডি ও গাঁজা কেনা হত এবং থাইল্যান্ড থেকে ভারতে এনে পুনে, অসম ও ভুটানে সরবরাহ করা হত।
এক গোয়েন্দা আধিকারিক জানান, আগে সংস্থাগুলির মূল লক্ষ্য ছিল দাউদ ইব্রাহিম চক্রকে দমন করা। বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। থাইল্যান্ডে বসে ভারতীয়দের নেতৃত্বে একাধিক মাদকচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং তারা বিপুল পরিমাণ মাদক বাজারে ঢোকানোর চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির সঙ্গে সমন্বয় রেখে এই চক্র দমনে কাজ চলছে বলে তিনি জানান।

