চড়িলাম, ২২ সেপ্টেম্বর:জল জীবন মিশনের প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে প্রায় দু’বছর আগে। সেই প্রকল্প চালু হয়ে ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষ পানীয় জলও পাচ্ছেন। অথচ কাজের বিল এখনও না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সিপাহিজলা জেলার একাধিক ঠিকাদার। দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বিল না মেলায় আর্থিক সংকটে পড়ে পুজোর আগে পাওনা টাকা না পেলে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
উল্লেখ্য, জল সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ জলের স্তর বৃদ্ধি এবং জল জীবন মিশনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে উল্লেখযোগ্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সিপাহিজলা জেলা উত্তর-পূর্ব জোনে ‘সেরা জেলা’ হিসেবে জাতীয় জল পুরস্কার পেয়েছে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করা হয়। কিন্তু জাতীয় স্তরে জেলার এই স্বীকৃতির পরও প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদাররা তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ।
ঠিকাদারদের দাবি, ২০২৪ সালের পর থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তাঁদের বিল আটকে রয়েছে। সম্প্রতি জল জীবন মিশনের জন্য রাজ্যে অর্থ বরাদ্দ হওয়ায় দীর্ঘ প্রায় দু’বছর পর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু সিপাহিজলা জেলার নির্বাহী বাস্তুকার দপ্তর থেকে প্রায় ৩৭৮ কোটি টাকার বকেয়া হিসাব দেওয়া হলেও মাত্র ২৭ কোটি টাকা পাওয়া গেছে বলে দাবি ঠিকাদারদের।
এই পরিস্থিতিতে আর্থিক সমস্যায় পড়েছেন বহু ঠিকাদার। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন বিল না পাওয়ায় ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালানো, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ বহন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। পাওনাদারদের চাপের পাশাপাশি শ্রমিকদের পাওনা মেটাতে না পারায় তাঁরাও ঠিকাদারদের বাড়িতে এসে টাকা চাইছেন বলে অভিযোগ।
ঠিকাদারদের একাংশ ইতিমধ্যেই নির্বাহী বাস্তুকারের দপ্তরে গিয়ে পুজোর আগে বকেয়া বিল না পেলে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। যদিও সম্প্রতি কিছু অর্থ বরাদ্দ হওয়ায় তাঁরা সাময়িকভাবে স্বস্তি পেলেও, নতুন করে কার্যস্থল পরিদর্শনের নির্দেশ ঘিরে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, তাঁদের অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ প্রায় দু’বছর আগেই ১০০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পগুলিতে ইতিমধ্যেই জল সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ পরিষেবা পাচ্ছেন। কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিকবার পরিদর্শন হয়েছে বলেও দাবি তাঁদের। দিল্লি থেকে জলশক্তি মন্ত্রকের প্রতিনিধিদের পরিদর্শন, জিও-ট্যাগিং, জেলা প্রশাসনের পরিদর্শন এবং অনলাইনে বিভিন্ন রিপোর্ট আপলোডের পরও নতুন করে সাইট পরিদর্শনের নির্দেশ কেন দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঠিকাদাররা।
তাঁদের আরও দাবি, এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে এক লক্ষ টাকার বেশি মূল্যের কাজের ক্ষেত্রে চলতি কাজের ভিত্তিতে অর্থ প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে। অথচ কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার প্রায় দু’বছর পর অর্থ আসার পরও নতুন করে পরিদর্শনের কারণে বিল আটকে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
ঠিকাদারদের বক্তব্য, একটি প্রকল্প শুরু হওয়ার পরই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিদর্শন, জিও-ট্যাগিং এবং অনলাইনে তথ্য আপলোড করা হয়। পাশাপাশি জাতীয় জল জীবন মিশনের অডিট এবং পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনও হয়ে থাকে। যে প্রকল্পগুলিতে বর্তমানে মানুষ পানীয় জল ব্যবহার করছেন, পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে কোনও অভিযোগ নেই এবং প্রকল্প পরিচালনার জন্য অপারেটরও নিয়োগ করা হয়েছে, সেই কাজের বিলের জন্য ফের সাইট পরিদর্শনের নির্দেশে তাঁরা বিস্মিত।
অন্যদিকে, সূত্রের খবর, বরাদ্দ অর্থ দ্রুত খরচ দেখাতে পারলে পরবর্তী পর্যায়ে আরও অর্থ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। দপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার রাজীব মজুমদার সমস্ত নির্বাহী বাস্তুকারকে আগামী সাত দিনের মধ্যে বরাদ্দ অর্থ খরচ করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। সম্প্রতি কুমারঘাটেও তিনি পুজোর আগে অর্থ আনার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন বলে সূত্রের দাবি।
তবে ঠিকাদারদের আশঙ্কা, বর্তমান গতিতে সাইট পরিদর্শন চলতে থাকলে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও প্রায় দু’মাস সময় লাগতে পারে। ফলে পুজোর আগে বকেয়া অর্থ পাওয়া নিয়ে তাঁরা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
ঠিকাদারদের দাবি, প্রকল্পের কোনও ত্রুটি বা ভুল ধরা পড়লে দপ্তরের হাতে এখনও বড় অঙ্কের অর্থ আটকে রাখার সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ কাজ হয়ে যাওয়ার পরও নতুন করে পরিদর্শনের মাধ্যমে বিল আটকে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
এদিকে, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় জল জীবন মিশনের অর্থ বরাদ্দ নিয়ে বিক্ষোভ ও অসন্তোষের খবরও সামনে আসছে। সিপাহিজলা জেলার ঠিকাদারদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন পর বরাদ্দ হওয়া অর্থের পরিমাণ যেখানে বকেয়ার তুলনায় অত্যন্ত কম, সেখানে দ্রুত বিল মিটিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে যদি নতুন করে পরিদর্শন প্রক্রিয়া শুরু হয়, তাহলে তাঁদের আর্থিক দুর্দশা আরও বাড়বে।
পুজোর আগে বকেয়া বিল মেটানো না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ঠিকাদাররা। তাঁদের আত্মহত্যার হুঁশিয়ারি ঘিরে এখন প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন তাঁরা।



















