ঢাকা, ১৬ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর ফটো গ্যালারিতে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলি জিন্নার প্রতিকৃতি স্থাপন এবং ঐতিহাসিক ছবি সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশের ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্ক। সংগঠনটি এই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’ বলে অভিহিত করেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং নিজেদের সরেজমিন পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করে সংগঠনটি জানিয়েছে, ফটো গ্যালারি থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি-সহ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক আলোকচিত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জিন্নার প্রতিকৃতি সেখানে স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
সংগঠনটির আরও দাবি, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যা এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগী রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর চালানো নৃশংসতার দলিল ও ছবি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকেও তারা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে।
‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে সংগঠনটি জানিয়েছে, ডাকসু মিউজিয়াম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থান। এই ধরনের সংরক্ষিত পরিকাঠামোয় কোনও পরিবর্তন করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন।
ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্কের বক্তব্য, ছাত্রনেতারা ব্যক্তিগত ইচ্ছা, দলীয় স্বার্থ বা উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শের ভিত্তিতে ইচ্ছামতো ঐতিহাসিক স্থাপনা বা প্রদর্শনীতে পরিবর্তন আনতে পারেন না।
জিন্নার প্রতিকৃতি স্থাপনের বিষয়েও সংগঠনটি তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের সময় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন জিন্না। পাশাপাশি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো গণহত্যার জন্য পাকিস্তান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি বলেও সংগঠনটি উল্লেখ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি স্মারকস্থানে জিন্নার প্রতিকৃতি স্থাপন ‘বাঙালি জাতির প্রতি চরম অপমান’ বলে মন্তব্য করেছে সংগঠনটি।
শেখ হাসিনার প্রতি বর্তমান রাজনৈতিক ক্ষোভের প্রভাব তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর চাপিয়ে তাঁর ছবি ডাকসু মিউজিয়াম থেকে সরিয়ে দেওয়াকে সংগঠনটি ‘সংবেদনহীন’ এবং ইতিহাস থেকে প্রকৃত নায়কদের মুছে ফেলার ‘সচেতন প্রচেষ্টা’ বলে অভিযোগ করেছে।
ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্কের দাবি, এই ঘটনাটি কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক এজেন্ডা’ এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই ধরনের উদ্যোগ মেনে নিতে পারেন না বলেও সংগঠনটি জানিয়েছে।
সংগঠনটি ডাকসু মিউজিয়ামকে কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়, বরং একটি জাতীয় স্মারক হিসেবে উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তদন্তের বাইরে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরিয়ে দেওয়া সমস্ত সামগ্রী ও ছবির পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তালিকা প্রকাশ এবং সেগুলিকে আগের জায়গায় পুনঃস্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর বাংলাদেশজুড়ে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানবিরোধী মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত বহু ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিসৌধ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা উপড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএএনএস



















