আগরতলা, ১০ সেপ্টেম্বর: ত্রিপুরার উপজাতি অধ্যুষিত এলাকার স্বশাসিত জেলা পরিষদ গড়ে ওঠার পেছনে বামফ্রন্ট সরকারের ধারাবাহিক আন্দোলন ও লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে দাবি করলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সিপিআইএম নেতা মানিক সরকার। বৃহস্পতিবার ধর্মনগরে ত্রিপুরা টি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের ১১তম রাজ্য সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত প্রকাশ্য সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এই দাবি করেন।
ত্রিপুরা টি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের ১১তম রাজ্য সম্মেলন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার ধর্মনগরের কালীদিঘির পাড়ে নেতাজি মূর্তির পাদদেশে এক জনসভার আয়োজন করা হয়। সিআইটিইউ ধর্মনগর মহকুমা কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানিক সরকার। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সিআইটিইউ কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক জিয়াউল হক, প্রাক্তন বিধায়ক অমিতাভ দত্ত, বিধায়ক শৈলেন্দ্র নাথ, বিধায়ক ইসলাম উদ্দিন-সহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃত্ব।
জনসভার আগে বামপন্থী কর্মী-সমর্থকদের অংশগ্রহণে ধর্মনগর শহরে একটি বিশাল মিছিল বের করা হয়। শহরের বিভিন্ন প্রধান সড়ক পরিক্রমা করে মিছিলটি কালীদিঘির পাড়ে পৌঁছায়। এরপর সেখানেই প্রকাশ্য সমাবেশ শুরু হয়।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মানিক সরকার বলেন, ত্রিপুরার উপজাতি এলাকার স্বশাসিত জেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বামফ্রন্ট সরকারের ধারাবাহিক লড়াইয়ের ভূমিকা রয়েছে। তাঁর দাবি, স্বশাসিত জেলা পরিষদের জন্য বামফ্রন্ট ছাড়া অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না। মূল লড়াই ছিল সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের দাবিকে কেন্দ্র করে।
মানিক সরকার বলেন, ষষ্ঠ তফসিলের সাংবিধানিক সুরক্ষা না থাকলে ভবিষ্যতে নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেকোনও সময় এই ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেই কারণেই বামফ্রন্ট সরকার ষষ্ঠ তফসিলের দাবিতে আন্দোলন ও রাজনৈতিক লড়াই চালিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
দীর্ঘ প্রায় দশ বছর পর রাজ্যে ভিলেজ কমিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। এই নির্বাচন প্রসঙ্গেও শাসক দলের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, প্রথম থেকেই বিজেপি ও তিপ্রা মথা ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা যাতে মনোনয়নপত্র জমা দিতে না পারেন, সেই চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দু’দিন রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় দখল করে রাখা হয়েছিল। এমনকি রিটার্নিং অফিসারের কাছ থেকে মনোনয়নপত্র কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সিপিআইএম প্রার্থীরা বহু কেন্দ্রে মনোনয়ন জমা দিতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানান মানিক সরকার। তাঁর দাবি, প্রায় ২,৪০০ কেন্দ্রে সিপিআইএম প্রার্থী দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বর্তমানে বাড়িঘরছাড়া অবস্থায় রয়েছেন এবং শাসক দলের কারণে তাঁরা নিজেদের গ্রামেও ঢুকতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
যদিও গত দুই বছরে পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে বলে দাবি করেন মানিক সরকার। এই পরিস্থিতিতে দলীয় প্রার্থী ও কর্মীদের ময়দান না ছাড়ার বার্তা দেন তিনি। সংগঠিতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াই জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সরব হন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর প্রশ্ন, এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যে গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকার কোথায় রয়েছে? তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকার ভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রহসনে পরিণত করেছে।
তিনি বলেন, মানুষের ভোটাধিকার এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক কর্মীদের আরও সক্রিয় হতে হবে। পাশাপাশি দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যের কৃষি, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও শ্রমিক স্বার্থে বামফ্রন্ট সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন মানিক সরকার।
তিনি বলেন, ইচ্ছা করলেই রাজ্যে কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই বামফ্রন্ট সরকার একই জমিতে উৎপাদন বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিয়েছিল। এক ফসলি জমিতে দুই ফসল এবং দুই ফসলি জমিতে তিন ফসল উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও বামফ্রন্ট সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল বলে দাবি করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি ত্রিপুরার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বামফ্রন্ট সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যের চাহিদার তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং রাজ্যের চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রপ্তানির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
শ্রমিকদের স্বার্থে বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিকা তুলে ধরে মানিক সরকার বলেন, তাঁদের সরকারের সময় প্রতি বছর শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হতো। শ্রম দপ্তর, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং মালিকপক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ ও বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হতো বলে তিনি জানান।
ত্রিপুরা টি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের রাজ্য সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই সমাবেশে চা শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা, শ্রমিক অধিকার এবং রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য রাখেন বাম নেতৃত্ব। ধর্মনগরের এই সমাবেশকে ঘিরে এদিন বিপুল সংখ্যক বামপন্থী কর্মী-সমর্থকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।























