অ্যাশভিল, ২ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): ভারতের অর্থনীতির বর্তমান ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধারাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি-সংক্রান্ত চাপ, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা এবং এল নিনোর প্রভাবের মধ্যেও ভারতের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক কর্মদক্ষতাকে তিনি ‘দৃঢ়’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এখানে জি২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে আইএএনএস-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে বাঙ্গা বলেন, ভারতের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দেশের অর্থনীতির ভিত কতটা শক্তিশালী, তা তুলে ধরছে। তিনি বলেন, ভারত নিয়মিতভাবে ৭ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করছে, যা যথেষ্ট ভালো। তবে এর থেকেও বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
ভারতের ৭.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে বিশ্বব্যাংক প্রধান বলেন, এর মধ্যে পরিষেবা খাতে ভালো বৃদ্ধি, রফতানিতে অগ্রগতি এবং বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা রয়েছে। তাঁর মতে, এগুলি ভারতের অর্থনীতির দৃঢ়তার গুরুত্বপূর্ণ দিক।
তবে শুধুমাত্র কোনও একটি ত্রৈমাসিকের প্রবৃদ্ধির দিকে নজর না দিয়ে সেই প্রবৃদ্ধিকে কর্মসংস্থান এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগে পরিণত করার ওপর জোর দেন বাঙ্গা। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও তার প্রসারের মাধ্যমে ভারতকে আরও এগিয়ে যেতে হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে তরুণদের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মসংস্থান তৈরির জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের কথাও তুলে ধরেন বাঙ্গা—ভৌত ও মানবিক পরিকাঠামো, নিয়ন্ত্রক সংস্কার এবং বেসরকারি পুঁজির ব্যবহার। তাঁর মতে, রাস্তা, সেতু, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ, জল এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে ভারত উল্লেখযোগ্য কাজ করছে। পাশাপাশি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও আরও অগ্রগতি প্রয়োজন।
ভারতের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের প্রয়োজনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। বাঙ্গার মতে, বেসরকারি খাত ভবিষ্যতে কোথায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষতা ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তুলতে হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্কারের প্রসঙ্গে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদিত শ্রম আইন সংস্কারের কথা উল্লেখ করেন বাঙ্গা। তবে তিনি বলেন, এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে রাজ্যগুলিকে নিজেদের স্তরে কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। কয়েক বছর আগের পরিস্থিতির তুলনায় এটি অবশ্যই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কর্মসংস্থান তৈরিতে বেসরকারি খাতের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বাঙ্গা বলেন, সরকার মূলত প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করে, কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি করে বেসরকারি খাত। এই ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প বা এমএসএমই-গুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেও তিনি জানান।
পরিকাঠামো, কৃষি, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা, পর্যটন এবং মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন শিল্পকে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট। খনিজ, ধাতু এবং ফ্যাশন শিল্পে ভারতের বিশেষ শক্তি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে পর্যটন ও এমএসএমই-র সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর আলোচনা হয়েছে বলেও জানান বাঙ্গা। ইরান যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক সংকটের সময় ভারতীয় ব্যবসাগুলিকে সহায়তা করতেও বিশ্বব্যাংক দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছিল বলে তিনি জানান। বাণিজ্যিক অর্থায়নের জন্য ভারতের এমএসএমই খাতে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
ভারত এখন অন্যান্য দেশের কাছেও উন্নয়নমূলক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেন বাঙ্গা। বিশেষ করে ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং কৃষিক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা অন্য দেশগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, ২০৪৭ সালের লক্ষ্যে ভারতের যাত্রা শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করবে না। বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ভারত কতটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে, তার ওপরও দেশের ভবিষ্যৎ সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।



















