নিউইয়র্ক, ৩০ আগস্ট (আইএএনএস): ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে গ্রহণ, সম্মান ও সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত বলেছেন, বিভিন্ন ধর্মের পথ আলাদা হলেও মানবতা এক। তাঁর মতে, বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজন কাটাতে শুধু জ্ঞান বা রাজনৈতিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সেই জ্ঞানকে দৈনন্দিন আচরণে পরিণত করতে হবে এবং স্থানীয় স্তর থেকে ঐক্য, ভালোবাসা ও নিঃস্বার্থ সেবার চর্চা শুরু করতে হবে।
নিউইয়র্কে ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড, ওয়ান হিউম্যানিটি’ কর্মসূচিতে ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভাগবত বলেন, তিনি এমন একটি সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয়—ধর্ম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানবতা এক।
তিনি বলেন, চূড়ান্ত সত্য এক হলেও মানুষ নিজেদের সীমিত উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেই সত্যকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। একই বাস্তবতাকে মানুষ ভিন্নভাবে উপলব্ধি করলেও তার অর্থ এই নয় যে কারও অভিজ্ঞতা মিথ্যা।
ভাগবত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং ধর্মের মূল উদ্দেশ্যের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে বলেন, নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক পথে চলার জন্য বিভিন্ন অনুশাসন প্রয়োজনীয় হলেও সেগুলিই ধর্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে না। তাঁর মতে, ধর্মের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে সত্যের দিকে নিয়ে যাওয়া।
ধর্মীয় অনুশীলনকে আলোর দিকে নির্দেশ করা আঙুলের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, কেউ যদি শুধু আঙুলটির দিকে তাকিয়ে থাকে এবং সেটি যে আলোর দিকে নির্দেশ করছে সেদিকে না তাকায়, তাহলে সে প্রকৃত উদ্দেশ্যটি উপলব্ধি করতে পারবে না।
বিভিন্ন ধর্মীয় পথের মধ্যে পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করে ভাগবত বলেন, মানুষের উপলব্ধির পার্থক্যের কারণেই পথও অনেক রকম। হিন্দু ঐতিহ্যের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আকাশ থেকে বিভিন্ন জায়গায় পড়া জল শেষ পর্যন্ত যেমন সমুদ্রেই গিয়ে মেশে, তেমনই বিভিন্ন আধ্যাত্মিক পথও শেষ পর্যন্ত একই গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
ভারত ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য আশ্রয়ের জায়গা ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বের কোথাও নিরাপদ আশ্রয় না পাওয়া বহু মানুষ ভারতে এসে নিজেদের জায়গা খুঁজে পেয়েছেন।
এই দর্শনের ভিত্তিতেই বিশ্বজুড়ে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া আরএসএসের দায়িত্ব বলে জানান ভাগবত। তাঁর কথায়, “বৈচিত্র্য আমাদের অন্তর্নিহিত ঐক্যের অলংকার। এটিকে গ্রহণ করতে হবে, সম্মান করতে হবে এবং সুরক্ষিত রাখতে হবে।” নিজের স্বাতন্ত্র্য যেমন রক্ষা করতে হয়, তেমনই অন্যের স্বাতন্ত্র্যও রক্ষা করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। কারণ, বৈচিত্র্য প্রকৃতির নিয়ম এবং ঐক্য তার অন্তর্নিহিত সত্য।
ভাগবত বলেন, মানুষের কাছে শান্তি, ভালোবাসা ও ঐক্যের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ইতিমধ্যেই রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম ও ঐতিহ্যের মধ্যেই এই শিক্ষার উপস্থিতি রয়েছে। সমস্যা জ্ঞানের অভাব নয়; সমস্যা হল সেই জ্ঞানকে মানুষের আচরণের অংশ করে তোলা।
তিনি বলেন, মানুষ অনেক সময় সঠিক কাজটি কী তা জানেন, কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দ, অভ্যাস ও প্রলোভনের কারণে সেই অনুযায়ী আচরণ করেন না। নিজের ডায়াবেটিসের উদাহরণ দিয়ে ভাগবত বলেন, তিনি জানেন যে চিনি এড়িয়ে চলা উচিত, কিন্তু মিষ্টি সামনে এলে কখনও কখনও নিজেকেই নানা অজুহাত দেন।
তাঁর মতে, ধর্মীয় বিভাজনের ক্ষেত্রেও একই বিষয় কাজ করে। মানুষ সঠিক বার্তা জানলেও সেই জ্ঞান আচরণে প্রতিফলিত হয় না। তাই শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষা যথেষ্ট নয়; ভালোবাসা, সেবা ও সম্মানের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানও এই অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, বিভিন্ন ধর্মের আচার মানুষকে দান ও সেবার শিক্ষা দেয়।
ভাগবত রামকৃষ্ণ পরমহংসের উদাহরণও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রামকৃষ্ণ পরমহংস ভারতীয় আধ্যাত্মিক ধারার পাশাপাশি ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের অনুশীলন করেছিলেন এবং তাঁর উপলব্ধি ছিল—পথ ও চিন্তা যতই ভিন্ন হোক, শেষ গন্তব্য এক। ভাগবতের মতে, এটি কেবল তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বাস্তব আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার বিষয়।
দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ আর. ডি. রানাডের বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মরমিয়া অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, বিভিন্ন পথ অনুসরণ করেও মানুষের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল দেখা যায়।
ভাগবত বলেন, বিশ্বে পরিবর্তন আনতে হলে প্রথমে নিজ নিজ সমাজে ছোট ছোট ঐক্য ও নিঃস্বার্থ সেবার মডেল তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আলোচনা করেই কাজ শেষ করা যাবে না। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে স্থানীয় স্তরে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
তিনি ধর্মীয় নেতাদের তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফিরে এই ধরনের উদ্যোগ শুরু করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, সফল স্থানীয় উদ্যোগগুলিকে পরে বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
আন্তঃধর্মীয় সংলাপকে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রদেশ, জেলা ও ব্লক স্তর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। স্থানীয় স্তরে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হলে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিভাজন কমবে এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশও বদলাতে শুরু করবে।
ভারতে মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে আরএসএসের সংলাপের কথাও তুলে ধরেন ভাগবত। ২০১৮ সালে দিল্লিতে তাঁর বক্তব্যের পর এই সংলাপ শুরু হয়েছিল বলে জানান তিনি। ফলাফল দ্রুত না এলেও ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ভাগবত বলেন, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নীতি, যুদ্ধ প্রতিরোধ এবং সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু পরিবর্তনের সূচনা সরাসরি রাজনীতির মাধ্যমে করা উচিত নয়।
তাঁর মন্তব্য, “রাজনীতি এখন স্বার্থের খেলায় পরিণত হয়েছে।” ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে সম্মিলিত স্বার্থের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “আমি”-কেন্দ্রিক চিন্তার বদলে “আমরা এবং আমাদের”-এর ভাবনা সামাজিক সমস্যার সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে।
গণতন্ত্রে জনমতের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে ভাগবত বলেন, শক্তিশালী জনমত তৈরি হলে রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষেও তা উপেক্ষা করা কঠিন। তাই প্রথমে সমাজের মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং তার ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে সরকারি নীতিকে প্রভাবিত করা সম্ভব।
ভাগবত আন্তঃধর্মীয় সংলাপের পাশাপাশি নিঃস্বার্থ সেবার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, সংলাপ ও সেবা পাশাপাশি চলতে হবে। আরএসএস প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সেবাকে সংগঠনের অন্যতম প্রধান কাজ হিসেবে দাবি করে তিনি বলেন, সাহায্যপ্রার্থীর ধর্ম বা পরিচয় না দেখে স্বেচ্ছাসেবকরা মানুষের পাশে দাঁড়ান।
ভাগবতের বক্তব্য অনুযায়ী, সমাজের সহযোগিতায় আরএসএস বিভিন্ন আকারে প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার সেবামূলক উদ্যোগ পরিচালনা করছে। তিনি ১৯৯৬ সালের হরিয়ানার চরখি দাদরি বিমান দুর্ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, সৌদি আরবের একটি বিমান এবং কাজাখস্তান এয়ারলাইন্সের একটি বিমানের সংঘর্ষের পর আরএসএসের স্বেচ্ছাসেবকরা উদ্ধার ও ত্রাণকাজে অংশ নিয়েছিলেন। নিহত ও আহতদের ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করেই তাঁরা সাহায্য করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
ভাগবত বলেন, সেবার মাধ্যমে মানুষ নিজেরাও পরিবর্তিত হতে পারেন। কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পর অনেকেই পরবর্তীতে অন্যদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। তাই ধর্মীয় নেতাদের নিজেদের দেশেও এমন নিঃস্বার্থ সেবার উদ্যোগ তৈরি করার আহ্বান জানান তিনি।
ভাগবত স্বীকার করেন যে সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন করা সহজ বা দ্রুত সম্ভব নয়। ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ঐক্যের জ্ঞান মানুষের মধ্যে থাকলেও তা আচরণে পরিণত করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
তাঁর মতে, নতুন অভ্যাসকে এতটাই শক্তিশালী করে তুলতে হবে যাতে অর্থ, ক্ষমতা ও শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে সেই পথ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে। তিনি ধর্মীয় নেতাদের ধৈর্য না হারিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
নিউইয়র্কের এই আন্তর্জাতিক সমাবেশে ৩০টি দেশের ১৮০-রও বেশি ধর্মীয় নেতা ও প্রতিনিধি অংশ নেন। যুদ্ধ, ঘৃণা, দারিদ্র্য ও ধর্মীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সহযোগিতা এবং মানবিক ঐক্যের পক্ষে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।
১৯২৫ সালে নাগপুরে কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২৫ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূর্ণ করেছে। ২০০৯ সাল থেকে মোহন ভাগবত সংগঠনের সরসংঘচালক বা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
























