নিউইয়র্ক, ৩০ আগস্ট (আইএএনএস): রাজনীতি এখন অনেকটাই “স্বার্থের খেলায়” পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত। তাঁর মতে, দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক পরিবর্তন আনতে হলে প্রথমে সমাজের ভিতর থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। স্থানীয় স্তরে ঐক্য, নিঃস্বার্থ সেবা এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপের পরিবেশ তৈরি করে তার ভিত্তিতেই সরকারি নীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা সম্ভব।
নিউইয়র্কে ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড, ওয়ান হিউম্যানিটি’ কর্মসূচিতে ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভাগবত বলেন, শুধুমাত্র রাজনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি করা বা গভীরে প্রোথিত সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “এসব রাজনীতির মাধ্যমে হয় না। দুঃখিত, কিন্তু বাস্তবতা হল, রাজনীতি এখন স্বার্থের খেলায় পরিণত হয়েছে।” ব্যক্তিগত স্বার্থের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব সামাজিক বিভাজনের সমাধানকে আরও কঠিন করে তুলেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর পরিবর্তে সম্মিলিত স্বার্থের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ভাগবত বলেন, “যেখানে শুধু ‘আমি’ রয়েছে, সেখানে কোনও সমাধান নেই। ‘আমরা এবং আমাদের’—এটাই সমাধান।” ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে সমাজের ভিতর থেকেই পরিবর্তনের কাজ শুরু করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
ভাগবত বলেন, ধর্মীয় নেতারা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে, যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং সরকারগুলিকে সঠিক নীতি গ্রহণে উৎসাহিত করতে চান। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সরাসরি রাজনীতির স্তর থেকে শুরু করা যাবে না। আগে সমাজে সংলাপ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমে জনমত তৈরি করতে হবে।
তাঁর মতে, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনেকটাই জনমতের ওপর নির্ভরশীল। সমাজে যদি শক্তিশালী জনমত তৈরি হয়, তাহলে কোনও রাজনৈতিক নেতার পক্ষেই তা উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভাগবত বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় নেতাদের তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফিরে স্থানীয় স্তরে ঐক্য ও নিঃস্বার্থ সেবার বাস্তব উদাহরণ তৈরি করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ছোট ছোট এলাকায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে একসঙ্গে নিয়ে এমন উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে, যা ভবিষ্যতের কাঙ্ক্ষিত বিশ্বের মডেল হিসেবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, “আমরা যে পৃথিবী চাই, তার মডেল নিজেদের জায়গা থেকেই তৈরি করতে হবে।” এরপর সেই উদ্যোগগুলিকে বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের মধ্যে সংযুক্ত করে ধারাবাহিক সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
আন্তঃধর্মীয় সংলাপকে শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রদেশ, জেলা এবং ব্লক স্তর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পক্ষে সওয়াল করেন আরএসএস প্রধান। তাঁর মতে, স্থানীয় স্তরে নিয়মিত যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়লে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস কমবে এবং সামাজিক পরিবেশও বদলাবে।
ভারতে মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে আরএসএসের সংলাপের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন ভাগবত। তিনি জানান, ২০১৮ সালে দিল্লিতে তাঁর বক্তব্যের পর এই সংলাপ শুরু হয়েছিল এবং ধাপে ধাপে তা এগিয়ে চলেছে। ফল পেতে সময় লাগলেও এই উদ্যোগ বন্ধ করা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ভাগবত বলেন, শুধু ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ঐক্যের কথা জানা যথেষ্ট নয়; সেই জ্ঞানকে দৈনন্দিন আচরণে পরিণত করতে হবে। ভালো আচরণকে এমন অভ্যাসে পরিণত করতে হবে, যা বস্তুগত লাভ, ক্ষমতা ও শ্রেষ্ঠত্বের আকর্ষণের বিরুদ্ধেও টিকে থাকতে পারে।
তিনি স্বীকার করেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্তঃধর্মীয় আলোচনায় অংশ নেওয়া কয়েকজন হয়তো প্রশ্ন তুলেছেন—এতগুলি বৈঠকের পরও বাস্তব পরিবর্তন কতটা হয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্য, ফল ধীরে এলেও কাজ চালিয়ে যেতে হবে। “আমাদের আরও একটি সংকল্প নিতে হবে—যত সময়ই লাগুক, আমরা নিরলসভাবে এই কাজ চালিয়ে যাব,” বলেন তিনি।
আরএসএস প্রধান দাবি করেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনও ধরনের বৈষম্য না করে সংগঠনটি মানুষের পাশে দাঁড়ায়। তাঁর মতে, আন্তঃধর্মীয় সংলাপের পাশাপাশি সেবামূলক কাজও একই সময়ে শুরু করা জরুরি।
তিনি বলেন, “সংলাপ প্রথম পদক্ষেপ। সেবা আরেকটি পদক্ষেপ নয়—দুটিই একই সঙ্গে শুরু হওয়া উচিত।” আরএসএসের প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সেবাকে সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ভাগবতের দাবি, আরএসএসের স্বেচ্ছাসেবকরা সাহায্যপ্রার্থীর ধর্ম বা পরিচয় বিবেচনা না করেই মানুষের পাশে দাঁড়ান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সমাজের সহযোগিতায় সংগঠনটি বিভিন্ন আকারে প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার সেবামূলক উদ্যোগ পরিচালনা করছে।
নিজের বক্তব্যের সমর্থনে ১৯৯৬ সালের হরিয়ানার চরখি দাদরি বিমান দুর্ঘটনার উদাহরণ দেন ভাগবত। ওই দুর্ঘটনায় সৌদি আরবের একটি বিমান এবং কাজাখস্তান এয়ারলাইন্সের একটি বিমানের মাঝ আকাশে সংঘর্ষ হয়েছিল। দুই বিমানের অধিকাংশ যাত্রীই মুসলিম ছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ভাগবত বলেন, দুর্ঘটনার পর আরএসএসের স্বেচ্ছাসেবকরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আহতদের সাহায্য করেন, মৃতদেহ উদ্ধারে সহযোগিতা করেন, শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করেন এবং পরে পরিবারের সদস্যদের মৃতদের শনাক্ত করতেও সহায়তা করেন। তাঁর বক্তব্য, সেই সময় স্বেচ্ছাসেবকরা দুর্ঘটনাগ্রস্তদের মুসলিম না অন্য কোনও ধর্মের তা বিবেচনা করেননি।
তিনি বলেন, রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকায় এবং কোনও বিনিময়ের প্রত্যাশা না থাকায় সংগঠনটি এভাবে কাজ করতে পারে। “আমরা করি, শুধু দিই। বিনিময়ে কিছু চাই না,” বলেন তিনি।
আরএসএসের বিভিন্ন সামাজিক কাজ সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রচার না হওয়ায় সংগঠনকে ঘিরে নানা ধারণা তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন ভাগবত। তাঁর মতে, বাইরে থেকে ধারণা তৈরির পরিবর্তে মানুষকে সংগঠনের কাজ কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, সেবামূলক কাজ শুধু মানুষের তাৎক্ষণিক সমস্যা দূর করে না, অনেক সময় তাঁদের মধ্যেও অন্যকে সাহায্য করার ইচ্ছা তৈরি করে। কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার পর কিছু মানুষ পরবর্তীতে অন্যদের সাহায্য করতে ফিরে আসেন বলেও জানান তিনি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় নেতাদেরও নিজেদের দেশে এই ধরনের নিঃস্বার্থ সেবার উদাহরণ তৈরি এবং তা আন্তঃধর্মীয় সংলাপের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান ভাগবত।
আরএসএস ১৯২৫ সালে নাগপুরে কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন। ২০২৫ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূর্ণ করেছে। ২০০৯ সাল থেকে মোহন ভাগবত সংগঠনের সরসংঘচালক বা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
_______



















