নিউইয়র্ক, ৩০ আগস্ট (আইএএনএস): ধর্মের নামে বিদ্বেষ, অপমান, অমানবিকীকরণ ও হিংসাকে প্রত্যাখ্যান করে বিশ্বজুড়ে সম্প্রীতি, পারস্পরিক সম্মান ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার আহ্বান জানালেন ৩০টি দেশের ধর্মীয় নেতারা। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আয়োজিত ‘ইউনিভার্সাল ওয়াননেস’ সমাবেশে এই অঙ্গীকার উঠে আসে। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত-সহ বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
শনিবার আয়োজিত সম্মেলনের আলোচনার পর ৩০টি দেশের প্রধান ধর্মগুলির ২০০-রও বেশি প্রতিনিধি এই আহ্বানপত্র তৈরিতে অংশ নেন। সেখানে বলা হয়, ধর্মের গভীর বিশ্বাস অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সম্মানের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। ধর্মকে কখনও বিদ্বেষ, অপমান, অমানবিকীকরণ বা হিংসাকে ন্যায্যতা দেওয়ার হাতিয়ার করা উচিত নয়।
ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব রিলিজিয়াস লিডার্সের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি-জেনারেল বাবা জৈন বলেন, ধর্ম মানুষের মধ্যে নিরাময়, পুনর্মিলন ও অনুপ্রেরণার অসাধারণ শক্তি রাখে। তবে ইতিহাসে ধর্মকে বিভাজন, বর্জন এবং হিংসার ন্যায্যতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়েছে। তাই প্রথমেই প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিজেদের বক্তব্য, শিক্ষা, প্রতিষ্ঠান ও আচরণ পর্যালোচনা করতে হবে।
আহ্বানপত্রে ধর্মীয় নেতারা পাঁচটি বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার কথা জানান। নিজেদের সম্প্রদায়ের শিক্ষা ও চর্চা পর্যালোচনা, কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আক্রান্ত হলে তার বিরুদ্ধে সরব হওয়া, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সীমারেখা পেরিয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে যৌথভাবে মানবসেবার কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তাঁরা বলেন, ঐক্যের অর্থ একরকম হয়ে যাওয়া নয় এবং নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকার অর্থ অন্যের প্রতি অবজ্ঞা করা নয়। তরুণদেরও বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়, যাতে কোনও সংঘাত বা বিপর্যয় ঘটার আগেই পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
ইমাম শরিফ বলেন, এই সমাবেশের সাফল্য নির্ভর করবে অংশগ্রহণকারীরা অনুষ্ঠান শেষে কী করেন তার ওপর। তাঁর কথায়, মানুষকে একে অপরকে জানতে হবে, কারণ “যে মানুষকে আমরা চিনি, তাকে ঘৃণা করা কঠিন।” তিনি আরও বলেন, একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে একই বিশ্বাস গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই।
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির মধ্যেও ঘৃণা যে আগের তুলনায় আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, সে বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। তাঁর মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিদ্বেষ সীমান্ত পেরিয়ে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। একই সময়ে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, বৈষম্য, অহংকার ও মানবিক অবমূল্যায়নের মতো পুরনো সমস্যাগুলিও সমাজে রয়ে গিয়েছে।
রেভারেন্ড থর্ন বলেন, মানুষকে বারবার শেখানো হচ্ছে কাকে ভয় করতে হবে, কাকে দায়ী করতে হবে এবং কাকে বাদ দিতে হবে। তার বিপরীতে এই সমাবেশ মানুষের মধ্যে একসঙ্গে বসা, একে অপরের কথা শোনা ও বোঝার বার্তা দিচ্ছে। রাবাই ব্লুমেনথালও বলেন, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরীয় মর্যাদা রয়েছে এবং প্রত্যেকের মূল্য অসীম।
সমাবেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহ উদীয়মান প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও আলোচনা হয়। ধর্মীয় নেতারা বলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেন মানবকল্যাণের অধীন থাকে এবং মানুষের মর্যাদা, সত্য, স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সংযোগকে শক্তিশালী করে—দুর্বল না করে।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আন্তঃধর্মীয় সহযোগিতার উদ্যোগে সংগঠনের পূর্ণ সমর্থনের কথা জানান। ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড, ওয়ান হিউম্যানিটি’ কর্মসূচিতে ৩০টি দেশের ১৮০-রও বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন।
ভাগবত বলেন, “আরএসএস তার সমস্ত শক্তি নিয়ে আপনাদের সঙ্গে রয়েছে, কারণ আমরা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি।” তাঁর মতে, ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে গ্রহণ, সম্মান ও সুরক্ষা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বৈচিত্র্য মানুষের অন্তর্নিহিত ঐক্যকে আরও সমৃদ্ধ করে। তাঁর কথায়, প্রকৃতির নিয়মই হল বৈচিত্র্য এবং তার অন্তর্নিহিত সত্য হল ঐক্য। এই বার্তা ভারতের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া আরএসএসের দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মুসলিমদের প্রতি আরএসএসের অবস্থান প্রসঙ্গে ভাগবত ২০১৮ সালে দিল্লিতে মুসলিম প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর একটি আলোচনার কথা উল্লেখ করেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণার অধীনে ভারতে মুসলিমদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে কি না। ভাগবত বলেন, তা হিন্দু ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর বক্তব্য, কোনও হিন্দু যদি মনে করেন ভারতে মুসলিম থাকা উচিত নয়, তাহলে তিনি হিন্দু থাকবেন না।
ভাগবত বলেন, মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভারতে ২০১৮ সালের পর থেকেই সংলাপ অব্যাহত রয়েছে। তাঁর মতে, সংলাপ ও সমাজসেবার কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং এর সূচনা হওয়া উচিত সমাজের ভিতর থেকেই, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নয়।
তিনি বলেন, রাজনীতি অনেক সময় স্বার্থের খেলায় পরিণত হয়। তাই প্রথমে সমাজে নিঃস্বার্থ সেবা ও ঐক্যের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এর মাধ্যমে জনমত তৈরি হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক নীতিতেও তার প্রভাব পড়বে।
আন্তঃধর্মীয় সংলাপকে জাতীয় স্তরের নেতৃত্বের বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রদেশ, জেলা ও স্থানীয় স্তর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান ভাগবত। তাঁর মতে, স্থানীয় পর্যায়ে একসঙ্গে কাজ করলে পারস্পরিক অবিশ্বাস কমবে এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সহযোগিতার বাস্তব উদাহরণ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, বিশ্বের যে ধরনের সমাজ ও পরিবেশ মানুষ দেখতে চায়, তার মডেল নিজেদের জায়গা থেকেই তৈরি করতে হবে। তবে মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও মানসিকতা পরিবর্তনে সময় লাগবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
সমাবেশে রক্ষাবন্ধনের প্রতীক হিসেবে অংশগ্রহণকারীরা একে অপরের হাতে রাখি বাঁধেন। আয়োজকদের মতে, এই প্রথাকে পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে বন্ধু, প্রতিবেশী, অপরিচিত মানুষ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে যত্ন, সুরক্ষা ও পারস্পরিক দায়িত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আরএসএস ১৯২৫ সালে কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের হাতে নাগপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়। মোহন ভাগবত ২০০৯ সাল থেকে সংগঠনের সরসংঘচালক বা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
________



















