নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২৩ আগস্ট: কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় রাজোর রু শরণার্থীরা পুনর্বাসন পেয়েছেন। কিন্তু শুধু পুণর্বাসন প্রদানই নয়, সরকার বিভিন্ন ট্রেডের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের আর্থ সামাজিক মান উন্নয়নেও সচেষ্ট রযেছে। আজ গোমতী জেলার অমরপুরের আনন্দধারা টাউন হলে আযোজিত রাজ্যস্তরের টুল কিট বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষিত ব্রু প্রার্থীদের হাতে টুল কিট তুলে দিয়ে প্রধান অতিথির ভাষনে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মালিক সাহা একথা বলেন। এই অনুষ্ঠানে তিনি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রু প্রার্থীদের স্টাইপেন্ড প্রদানের প্রক্রিয়ার সূচনা করেন এবং দক্ষতা উন্নয়ন অধিদপ্তরের একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে মোট ১,৮৭৭টি টুল কিট এবং ২৫৫টি ড্রাইভিং লাইসেন্স বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি ৪,৫৫৪ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রার্থীর প্রত্যেককে ২,০০০ টাকা করে মোট ৯১ লক্ষ ৮ হাজার টাকা স্টাইপেন্ড প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ২০১৮ সাল নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ব্লু রিয়াং গোষ্ঠীর স্থায়ী পুণর্বাসন ও সমস্যার দীর্ঘমিয়াদী সমাধান নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার কাজ করে চলছে। মুখ্যমন্ত্রী বিশেষভাবে পুনর্বাসিত রু-রিয়াংদের জন্য স্থায়ী জীবিকা ও আযের সুযোগ নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, প্রকৃত অর্থে পুনর্বাসন তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন প্রতিটি পরিবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে এবং মর্যাদার সঙ্গে উপার্জন করতে সক্ষম হয়। আজ যে টুল কিটগুলি তুলে দেওয়া হয়েছে, তার মাধ্যমে সুবিধাভোগীরা অবিলম্বে উপার্জনের সুযোগ পাবেন। কারণ তারা যে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন, সেই প্রশিক্ষণকে বাস্তবে কাজে লাগানোর জন্য প্রযোজনীয় সরআমও এখন তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দিক নির্দেশনার কথা স্মরণ করে মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের মূল লক্ষ্য হল যুবক প্রার্থীদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সেই প্রশিক্ষণকে জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করা। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই রু প্রার্থীদের মৌলিক পরিষেবা প্রদান করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় দক্ষতা উন্নয়ন হল স্বাভাবিক পরবর্তী পদক্ষেপ।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক ব্রু প্রার্থীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তার মুখের অভিব্যক্তি থেকেই স্পষ্ট যে, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তার জীবনে প্রকৃত আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, রামকৃষ্ণ মিশনের সহযোগিতায় দক্ষতা উন্নয়ন অধিদপ্তর বিদেশি ভাষা শিক্ষার প্রশিক্ষণও শুরু করেছে। এর ফলে রাজ্যের যুবকদের জন্য আতিথেয়তা, পর্যটন, অনুবাদ, বিজনেস প্রসেস সার্ভিস এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত সুযোগ তৈরি হবে।
শিল্প ও বাণিজ্য দন্তরের অধীন দক্ষতা উন্নয়ন অধিদপ্তর রু পুনর্বাসন কলোনিগুলিতে একটি বিশেষ দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর মূল লক্ষ্য হল-প্রতিটি ব্রু পরিবারের অন্তত: একজন সদস্যকে কোনও একটি পেশায় প্রশিক্ষিত করে উপার্জনে সক্ষম করে তোলা। প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে এবং ক্যাম্পের ভিতরে অথবা ক্যাম্পের কাছাকাছি এলাকায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে কোনও প্রার্থীকে প্রশিক্ষণের জন্য পরিবার বা পুনর্বাসন এলাকা ছেড়ে যেতে না হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রত্যেক যোগ্য প্রার্থীকে টুল কিট প্রদান করা হচ্ছে। একইভাবে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা উপার্জনের সুযোগ পান।
২০২৪ সাল থেকে দুই পর্যায়ে এই কর্মসূচির আওতায় ৪১টি বিভিন্ন ট্রেডে ৪,২৮৮টি পরিবারের মোট ৫,১২৬ জন ব্রু যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর জন্য মোট ১৬.২৫ কোটি টাকা ব্যয়ের সংস্থান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন ট্রেডের মধ্যে রয়েছে পশুপালন ও কৃষি, নির্মাণ, বস্ত্র ও হস্তুততি, পরিবহণ, নবায়নযোগ্য শক্তি, পরিষেবা এবং ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসা। বিশেষ করে সেলাই, হস্তুততি, মাশরুম চাষ, মৌমাছি পালন এবং আচার তৈরির মতো ক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। এর ফলে বহু পরিবারে দ্বিতীয় উপার্জনকারী হিসেবে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। প্রশিক্ষণের ট্রেডগুলির মধ্যে রয়েছে সেলাই, মাশরুম চাষ, মৌমাছি পালন, রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, সোলার এলইডি ও সোলার পিন্ডি, দু’চাকার যানবাহন মেরামত, নাপিত, ঐতিহ্যবাহী হস্ততাঁত, বাঁশের সামগ্রী তৈরি, স্ট্রিট ফুড বিক্রয় এবং রাস্তার ধারের খাদ্য পরিষেবা।
বক্তব্য রাখেন ত্রিপুরা বিধানসভার অধ্যক্ষ রামপদ জমাতিয়া ও বিধায়ক রঞ্জিত দাস। এছাড়া স্বাগত ভাষণ রাখেন শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের সচিব, কিরণ গিতো। অনুষ্ঠানে ব্রু প্রশিক্ষণের বিষয়ে একটি তথ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলন গোমতী জিলা পরিষদের সভাধিপতি দেবল দেবরায়, বিধায়ক জীতন্দ্র মজুমদার, গোমতী জেলার জেলাশাসক রিঙ্কু লাখের, দক্ষতা উন্নয়ন অধিদপ্তরর অধিকর্তা প্রদীপ কে, পুলিশ সুপার অনির্বাণ দাস প্রমুখ। অনুষ্ঠানের পর অতিথিগণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রার্থীদের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে আয়োজিত স্টল ও প্রদর্শনী কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।


















