ঢাকা, ১৮ জুলাই (আইএএনএস): বাংলাদেশে মানব পাচারের সমস্যা এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে নারী ও কিশোরীরা লিঙ্গ বৈষম্য, বাল্যবিবাহ, শিক্ষার সীমিত সুযোগ এবং শ্রমবাজারে বৈষম্যের কারণে পাচারকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের দৈনিক ‘দ্য এশিয়ান এজ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবাধিকার কর্মীরা মেয়েদের শিক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগ, নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, নারীদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন বাড়ানো গেলে দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব ও ভুয়ো প্রতিশ্রুতিকে কাজে লাগিয়ে মানব পাচারকারীরা যে ফাঁদ পাতে, তা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ মানব পাচারের শিকার হচ্ছেন। অপরাধচক্রগুলি দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অনিয়মিত অভিবাসন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সামাজিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে চাকরি, শিক্ষা বা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণার শিকার করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানব পাচারের সমস্যা শুধু সীমান্ত পারাপারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের গ্রামীণ এলাকা থেকে বহু মানুষকে শহরে এনে জোরপূর্বক শ্রম, গৃহস্থালির কাজ কিংবা বাণিজ্যিক যৌন শোষণের মতো কাজে বাধ্য করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহু পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট পাচারকারীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করছে। তরুণদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্ব, শিক্ষার সীমিত সুযোগ এবং উন্নত জীবিকার আকাঙ্ক্ষা অনেককে অনানুষ্ঠানিক নিয়োগকারীদের মাধ্যমে বিদেশে কাজের চেষ্টা করতে উৎসাহিত করছে। অসাধু দালালরা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পাশাপাশি জাল ভ্রমণ নথি সরবরাহ করছে। বিদেশে পৌঁছানোর পর অনেকের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, মজুরি আটকে রাখা হচ্ছে এবং তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করে দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে মানব পাচারের কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে। এখন পাচারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ এবং অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে সম্ভাব্য শিকারদের খুঁজে বের করছে।
এছাড়া ভুয়ো চাকরি প্রদানকারী সংস্থা, প্রতারণামূলক বৃত্তি প্রকল্প এবং ভুয়ো বিয়ের প্রস্তাবের মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে তাদের পাচারের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, সাইবার-নির্ভর মানব পাচার এখন নতুন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে, যা মোকাবিলায় একাধিক দেশের মধ্যে সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনকেও বাংলাদেশে মানব পাচারের একটি নতুন কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততার কারণে বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। ফলে জীবিকার সন্ধানে তাদের অন্যত্র যেতে হচ্ছে এবং এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে পাচারচক্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তুচ্যুত মানুষের স্থায়ী বাসস্থান, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাব তাদের আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। তাই জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে মানব পাচারবিরোধী কৌশলের সঙ্গে সমন্বিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।



















