ওয়াশিংটন, ১৮ জুলাই (আইএএনএস): পাঞ্জাব-ভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সন্দেহভাজন সদস্য নীতিশ কৌশল ওরফে ‘লালা’ কানাডায় পালানোর চেষ্টা করছিলেন বলে দাবি করেছে মার্কিন তদন্তকারী সংস্থা এফবিআই। নতুন আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, কানাডা সীমান্ত থেকে এক মাইলেরও কম দূরত্বে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তকারীদের নজরদারিতে থাকা মোবাইল ফোন ফেলে দেওয়া, ভুয়ো পরিচয়পত্র ব্যবহার এবং কয়েকদিন ধরে আত্মগোপন করার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
আদালতে জমা দেওয়া ৪৪ পাতার অভিযোগপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে আইএএনএস জানিয়েছে, ভারতীয় নাগরিক নীতিশ কৌশলকে ১৬ জুলাই ভারমন্টের আলবার্গ এলাকায় গ্রেফতার করা হয়। তাঁকে এফবিআই-এর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায়ও রাখা হয়েছিল। ফেডারেল প্রসিকিউটররা আদালতের কাছে আবেদন করেছেন, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে হেফাজতেই রাখা হোক, কারণ তিনি সমাজের জন্য বিপজ্জনক এবং পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন প্রসিকিউটরদের দাবি, ২৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি নীতিশ কৌশলের বিরুদ্ধে রিকো (চাঁদাবাজ-প্রভাবিত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সংগঠনসমূহ) আইনে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে চার্জ গঠন করে। ৭ জুলাই তাঁকে গ্রেফতারের চেষ্টা হলেও তিনি পালিয়ে যান। এরপর তদন্তকারীদের নজরদারিতে থাকা মোবাইল ফোন ফেলে দিয়ে আত্মগোপন করেন বলে অভিযোগ।
আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৬ জুলাই সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি একটি গাড়ি ফেলে রেখে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন নীতিশ। একই সময় কানাডার আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাও সীমান্তের ওপারে একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে হেঁটে যেতে দেখেছিল। যদিও সেই ব্যক্তিই নীতিশ কৌশল ছিলেন, এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা হয়নি।
প্রসিকিউটরদের দাবি, ভারমন্টের এক বাসিন্দা বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরায় এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গাড়ির ভিতরে উঁকি দিতে এবং পরে একটি গোয়ালঘরে ঢুকতে দেখেন। পরে মার্কিন বর্ডার পেট্রোল তাঁকে আটক করলে তিনি অন্য এক ব্যক্তির নামে জারি হওয়া নিউ জার্সির ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখান। আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করে তাঁর প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। তদন্তকারীরা তাঁর শরীরে থাকা বিশেষ সিংহের উল্কির ছবিও আদালতে প্রমাণ হিসেবে জমা দিয়েছেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নীতিশ কৌশল ১৫ জন অভিযুক্তের মধ্যে একজন, যাঁরা ‘জগ্গু ভগবানপুরিয়া অর্গানাইজড ক্রাইম গ্রুপ’-এর সদস্য বলে দাবি করা হয়েছে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, পাঞ্জাবে গড়ে ওঠা এই আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রিটেন, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। একসময় লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সহযোগী বলে পরিচিত জগ্গু ভগবানপুরিয়া পরে নিজস্ব অপরাধচক্র গড়ে তোলেন বলেও অভিযোগ।
তদন্তকারীদের দাবি, এই চক্র খুনের সুপারি, অপহরণ, মাদক পাচার, তোলাবাজি, আগ্নেয়াস্ত্র পাচার, অর্থপাচার এবং মানবপাচারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করত। প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল এবং নিজেদের অপরাধচক্র রক্ষায় নিয়মিত হিংসার আশ্রয় নেওয়া হতো বলেও অভিযোগ।
নীতিশ কৌশলের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১০ জুলাই ক্যালিফোর্নিয়ায় এক ব্যক্তিকে অপহরণ ও মারধরের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ, চক্রের সদস্যরা সন্দেহ করেছিল ওই ব্যক্তি তাদের মাদকের চালান চুরি করেছেন। তাঁকে অপহরণ করে ৫০ হাজার ডলার আদায়ের জন্য আটকে রাখা হয়েছিল। পরে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে জগ্গু ভগবানপুরিয়ার নির্দেশে ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া আদালতের নথিতে দাবি করা হয়েছে, নীতিশ কৌশল ২০২২ সালে অ্যারিজোনার ইউমা সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। ২০২৩ সালে তাঁর বিরুদ্ধে খুন, খুনের চেষ্টা, ষড়যন্ত্র এবং অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের হলেও শেষ পর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্র-সংক্রান্ত অপরাধে ৬০ দিনের কারাদণ্ড হয়। ২০২৬ সালে তাঁর বিরুদ্ধে একটি মাদক-সংক্রান্ত মামলাও রয়েছে বলে প্রসিকিউটরদের দাবি।
ফেডারেল প্রসিকিউটরদের বক্তব্য, মামলার গুরুত্ব, সরকারের হাতে থাকা প্রমাণ এবং গ্রেফতারের আগে নীতিশ কৌশলের পালানোর চেষ্টা প্রমাণ করে যে তাঁকে জামিন দিলে তিনি ফের পলাতক হতে পারেন। তাই জননিরাপত্তার স্বার্থে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে হেফাজতেই রাখার আবেদন জানানো হয়েছে।



















