টোকিও, ৭ জুলাই (আইএএনএস): জাপানে বসবাসকারী তিব্বতিরা টোকিওতে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে চীনের নতুন ‘এথনিক ইউনিটি অ্যান্ড প্রোগ্রেস প্রমোশন’ আইনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। একই সঙ্গে তারা তিব্বতি ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জাপানে তিব্বতি সম্প্রদায়ের সাবেক প্রতিনিধি কালদেন ওবারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, নতুন এই আইন তিব্বতি ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং জাতিগত পরিচয়ের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে।
তিনি বলেন, আমাদের সংস্কৃতি ও ভাষা যদি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে তিব্বতি জাতিও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এটি কখনোই হতে দেওয়া যাবে না। চীন তিব্বত দখল করার পর থেকে তিব্বতি জাতিসত্তাকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা কখনোই আত্মসমর্পণ করব না।
গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া চীনের ‘এথনিক ইউনিটি অ্যান্ড প্রোগ্রেস প্রমোশন’ আইন অনুযায়ী, ‘চীনা জাতির ঐক্য’ বিপন্ন করে এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে এবং মানক চীনা ভাষা (ম্যান্ডারিন) সর্বত্র ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই আইন তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় জোরপূর্বক সাংস্কৃতিক একীকরণ বা আত্মীকরণ নীতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
বিক্ষোভ চলাকালে অংশগ্রহণকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে আত্মাহুতি দেওয়া তিব্বতি কর্মী লোবগা রাংজেনের স্মরণে প্রার্থনা করেন। ৪২ বছর বয়সী লোবগা রাংজেন প্রায় ২০ বছর আগে শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
গত ২ জুলাই নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে তিব্বতের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে প্রার্থনা করার পর তিনি নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কালদেন ওবারা বলেন, লোবগার আত্মাহুতির উদ্দেশ্য ছিল তিব্বতের পরিস্থিতির প্রতি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
এদিকে, গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে চীনের ‘এথনিক ইউনিটি অ্যান্ড প্রোগ্রেস’ আইনের বিরুদ্ধে ৪০০-রও বেশি মানুষ শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নেন। ওয়ার্ডম্যুলেপ্লাৎস থেকে জুরিখে চীনের কনস্যুলেট জেনারেল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই পদযাত্রার আয়োজন করে তিব্বতীয় কমিউনিটি অব সুইজারল্যান্ড অ্যান্ড লিচেনস্টেইন। এতে সহযোগিতা করে তিব্বতি ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন ইন ইউরোপ (টিওয়াইএই), সুইস-তিব্বত ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশন (জিএসটিএফ), ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস, সুইস তিব্বতি উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন এবং দ্য চার্চ অব অলমাইটি গড।
বিক্ষোভকারীরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি এই আইন প্রত্যাখ্যান এবং তিব্বতি, উইঘুরসহ অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে দালাই লামার প্রতিনিধি থিনলে চুকি এবং রিকন মঠের ভিক্ষু ভেনারেবল খেনপো তেনজিন জাংচুপ বক্তব্য রাখেন।
ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস, সুইস তিব্বতি উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন এবং দ্য চার্চ অব অলমাইটি গডের প্রতিনিধিরাও এই আইন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একে তিব্বতি, উইঘুর এবং অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য হুমকি বলে মন্তব্য করেন।
থিনলে চুকি বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারও এই আইন বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ এটি প্রকৃত অর্থে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য নয়; বরং তিব্বতি, উইঘুর এবং অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের পরিচয় মুছে ফেলা এবং জোরপূর্বক আত্মীকরণের পথ সুগম করার জন্য প্রণীত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমি তিব্বতে আত্মাহুতি দেওয়া ১৫৭ জনেরও বেশি তিব্বতির প্রতি সংহতি জানাই, যারা দালাই লামার প্রত্যাবর্তন এবং তিব্বতের স্বাধীনতার দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছেন। একই সঙ্গে আমি সুইজারল্যান্ড ও লিচেনস্টেইনের তিব্বতি সম্প্রদায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছি, যারা এই আইন বাতিল ও প্রত্যাখ্যানের দাবি জানাচ্ছে।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নীরবতা ভেঙে তিব্বতের স্বাধীনতা, উইঘুর জনগণের প্রতি সংহতি এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চীনের আত্মীকরণ নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।



















