ওয়াশিংটন, ২৪ জুন (আইএএনএস): ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং অভিবাসন ক্ষেত্রে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পক্ষে জোরালো দ্বিদলীয় সমর্থন জানালেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা। একইসঙ্গে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে ভারত-বিরোধী ও হিন্দু-বিরোধী মনোভাব বৃদ্ধির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এই বার্তা উঠে আসে ফাউন্ডেশন ফর ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ডায়াসপোরা স্টাডিজ-এর উদ্যোগে আয়োজিত চতুর্থ বার্ষিক ক্যাপিটল হিল অ্যাডভোকেসি অনুষ্ঠানে। এতে ২৫টি অঙ্গরাজ্য থেকে ১৫০-রও বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন এবং কংগ্রেস ও সিনেট সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেন।
রজার মার্শাল ভারতীয়-আমেরিকানদের যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সফল অভিবাসী সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “যখন কেউ বৈধ অভিবাসনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন ভারতীয়-আমেরিকানরাই তার জবাব।”
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশেরও কম হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয়-আমেরিকানরা ব্যবসা, চিকিৎসা এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখছেন।
ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করে মার্শাল বলেন, “ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলির মধ্যে অন্যতম এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার।”
স্যানফোর্ড বিশপ ভারত ও আমেরিকার ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, মহাত্মা গান্ধী-র অহিংস দর্শন মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
তিনি দক্ষ কর্মীদের জন্য এইচ-১বি ভিসা এবং শিক্ষার্থীদের ভিসা ব্যবস্থা বজায় রাখার পক্ষে মত দেন। পাশাপাশি চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা, সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালীকরণ এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বিষপ যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দু-বিরোধী মনোভাব মোকাবিলারও প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
জেমস ওয়াকিনশ বলেন, ভারত একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অপরিহার্য অংশীদার। তিনি অভিবাসন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং দেশভিত্তিক ভিসা সীমাবদ্ধতা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
দীর্ঘদিনের ভারতপন্থী কংগ্রেস সদস্য ব্র্যাড শেরম্যান বলেন, গত তিন দশকে ভারত-আমেরিকার বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। তিনি ভারতীয় পেশাজীবীদের জন্য ভিসা জট কমানোর প্রচেষ্টার কথাও তুলে ধরেন।
বিল হুইজেঙ্গা, যিনি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান, বলেন দুই দেশই একটি মুক্ত, উন্মুক্ত এবং নিরাপদ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি চলমান বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আশাবাদও ব্যক্ত করেন।
সবচেয়ে জোরালো বক্তব্য রাখেন রাজা কৃষ্ণমূর্তি। তিনি বলেন, ভারতীয়-আমেরিকানরা ক্রমবর্ধমানভাবে হিন্দু-বিরোধী ও ভারত-বিরোধী বিদ্বেষের মুখোমুখি হচ্ছেন।
তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের রাজনীতিতে আরও সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনার যদি আলোচনার টেবিলে আসন না থাকে, তবে আপনি নিজেই আলোচনার বিষয় হয়ে যাবেন।”
সুহাস সুব্রামান্যম গ্রিন কার্ড ও ভিসা জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভারত থেকে আসা বিপুল প্রতিভার সুবিধা নিতে পারছে না।
রব ব্রেসনাহান ভারতকে আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বলে উল্লেখ করেন এবং ভারতীয়-আমেরিকানদের উদ্যোক্তা, শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে অবদানের প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতা বব পেকার বলেন, ইহুদি-বিরোধী ও হিন্দু-বিরোধী বিদ্বেষের মধ্যে মিল রয়েছে এবং এই দুই সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়কে প্রান্তিক করার চেষ্টা বাড়ছে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বেথানি পাউলোস মরিসন ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা দ্রুত বাড়ছে।
ভারতের উপ-হাইকমিশনার নামগ্যা সি. খাম্পা বলেন, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারিত্বে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, “এই সম্পর্কের ভিত্তি প্রতি বছর আরও শক্তিশালী হচ্ছে। বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতি যেমন হয়েছে, তেমনি ভারতীয় প্রবাসীরাও এই সম্পর্ককে জনগণের অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত করেছেন।”
এফআইআইডিএস-এর নেতা খান্দেরাও কান্দ জানান, প্রতিনিধি দল ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খল, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, বাণিজ্য, এইচ-১বি ভিসা, অভিবাসন সংস্কার এবং ভারত-বিরোধী ও হিন্দু-বিরোধী বক্তব্য নিয়ে আলোচনা করেছে। তাঁদের মতে, ক্যাপিটল হিলে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে বিস্তৃত দ্বিদলীয় সমর্থন রয়েছে।
বর্তমানে ৫০ লক্ষেরও বেশি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং সরকারি পরিষেবায় তাঁদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ভারত-আমেরিকা সম্পর্ককে আরও গভীর ও প্রভাবশালী করে তুলেছে।
_______



















