কলকাতা, ২২ জুন : পশ্চিমবঙ্গের স্বাধীনতার পর প্রথম বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের পূর্ণাঙ্গ বাজেট সোমবার বিধানসভায় পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য ৪.৩৮ লক্ষ কোটি টাকার এই বাজেটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সামাজিক কল্যাণ, শিল্পায়ন, কর কাঠামোর সরলীকরণ এবং পরিকাঠামো উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাজেট পেশ করে অর্থমন্ত্রী জানান, রাজ্য সরকার পূর্ববর্তী সরকারের কাছ থেকে ৮.১৫ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। তবুও উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বেকারত্ব মোকাবিলায় রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দফতরে এক লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগের ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার পদ পুলিশ বিভাগে, ৫০ হাজার পদ সরকারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগে এবং বাকি ৩০ হাজার পদ অন্যান্য দফতরে পূরণ করা হবে। নতুন নিয়োগের ৩৩ শতাংশ পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্নিবীরদের জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজ্য সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) ১৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৮ শতাংশ করার ঘোষণা করা হয়েছে, যা আগামী ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে। সিভিক ভলান্টিয়ারদের মাসিক ভাতা ২,০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
‘ভরসা’ নামে নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে বেকার স্নাতকদের মাসে ৩,০০০ টাকা এবং অন্যান্য যোগ্য বেকারদের ২,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কলেজপড়ুয়াদের এককালীন ২৫,০০০ টাকা অনুদান দেওয়া হবে।
এছাড়া রাজনৈতিক হিংসার শিকার পরিবারগুলির জন্য আর্থিক সহায়তা, ঝাড়গ্রামে আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে ১০ কোটি টাকা, অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ৩৬ কোটি টাকা এবং আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় সাত কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসুরক্ষার জন্য ৩,১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
সাধারণ করদাতাদের উপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে পেশাগত করের ক্ষেত্রে ছাড়ের সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
বেতনভোগীদের ক্ষেত্রে মাসিক করমুক্ত আয়ের সীমা ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। স্বনিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য বার্ষিক করমুক্ত সীমা ৬০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২.৫ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পেশাগত করের আওতায় আসার জন্য বার্ষিক টার্নওভারের সীমা ৫ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লক্ষ টাকা করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর সদস্যদের পেশাগত কর থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ারও ঘোষণা করা হয়েছে।
শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একক-জানালা (সিঙ্গল উইন্ডো) ব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্ত অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কল্যাণীতে ১,৫০০ একর জমির উপর নতুন গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর, পূর্ব মেদিনীপুরের দাদনপাত্রবাড়ে গভীর সমুদ্রবন্দর, পুরুলিয়া, মালদা ও বালুরঘাটে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ এবং কোচবিহার বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া দানকুনি-লুধিয়ানা ও দানকুনি-সুরত ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর প্রকল্পে জমি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান এবং কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জ পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগের কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজ্যে নতুন মদের দোকানের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বা ধর্মীয় স্থানের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন লাইসেন্স দেওয়া হবে না। কলকাতা পুরসভার এলাকায় এই দূরত্বসীমা ৫০০ মিটার নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেট অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে রাজ্যের নিজস্ব কর রাজস্ব ১,৩০,৬৬৯.৬৮ কোটি টাকায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের সংশোধিত হিসাবের ১,১১,৭৩৭.১৩ কোটি টাকার তুলনায় অনেক বেশি।
অন্যদিকে রাজস্ব ঘাটতি কমে ২১,৯৮৪.৪১ কোটি টাকা এবং আর্থিক ঘাটতি কমে ৬২,৪২১.৩৭ কোটি টাকায় নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা আর্থিক অবস্থার উন্নতির ইঙ্গিত দেয়।
তবে রাজ্যের মোট সঞ্চিত ঋণের পরিমাণ ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ নাগাদ বেড়ে ৮,১৫,৮৯১.৩৫ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে বলে বাজেটে অনুমান করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, এই বিপুল ঋণের বোঝা বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে।
























