শিলং, ১ জুন (আইএএনএস): শিশুদের প্রাথমিক বিকাশ, মাতৃস্বাস্থ্য এবং সামাজিক কল্যাণের ক্ষেত্রে উন্নত ফলাফল অর্জনের জন্য শক্তিশালী বাস্তবায়ন ব্যবস্থা, সমন্বিত প্রশাসন এবং ফলাফলভিত্তিক নীতি প্রয়োগের উপর জোর দিলেন মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কে. সাংমা।
সোমবার শিলংয়ে আয়োজিত তিন দিনের ‘আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট (ইসিডি) ইমপ্লিমেন্টেশন সায়েন্স ওয়ার্কশপ’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নমূলক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজ্ঞান, তথ্য ও নীতিগত সমাধান সম্পর্কে সরকারগুলির ধারণা রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হল সেগুলির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয়।
শিলংয়ের ভিভান্তা হোটেলে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় মুখ্যমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৮ সালে প্রথমবার দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বলেছিলেন যে অর্থবহ পরিবর্তন আনতে সবসময় নতুন প্রকল্প বা নীতির প্রয়োজন হয় না; বরং বিদ্যমান প্রকল্পগুলির আরও ভালো বাস্তবায়নই আসল বিষয়।
একজন লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, একবার সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “আমি আলাদা কিছু করব না, তবে কাজগুলো আলাদাভাবে করব।”
তাঁর মতে, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের অধিকাংশ প্রকল্পই উন্নয়নমূলক সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে তৈরি। কিন্তু সাফল্য নির্ভর করে সেগুলি কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার উপর।
মেঘালয়ে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে সাঙ্গমা বলেন, উন্নত বাস্তবায়ন ব্যবস্থার ফলে কেন্দ্রীয় প্রকল্প এবং বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলির ব্যবহার ও বাস্তবায়ন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মনরেগার উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, উন্নত বাস্তবায়নের ফলে প্রকল্পটির ব্যবহার প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে মেঘালয়ে প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকার বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা অনেক ছোট রাজ্যের প্রকল্প পোর্টফোলিওর চেয়েও বেশি।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা সমস্যাগুলি জানি, সেগুলির পেছনের বিজ্ঞান, তথ্য ও বিশ্লেষণও বুঝি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন আনার জন্য দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, একমাত্রিক সমাধানের পরিবর্তে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করাই গুরুত্বপূর্ণ।
মাতৃমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে মেঘালয়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সাঙ্গমা জানান, প্রথমে সরকার মনে করেছিল শুধুমাত্র হাসপাতালে প্রসবের সংখ্যা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু পরে দেখা যায়, অর্থনৈতিক ও পরিবহণজনিত সমস্যাও বড় বাধা।
তিনি বলেন, “আমরা হাসপাতালে প্রসবকে উৎসাহিত করছিলাম, কিন্তু মায়েদের আর্থিক বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিইনি।”
এই সমস্যার সমাধানে সরকার বিপুল সংখ্যক অ্যাম্বুল্যান্স কেনার পরিবর্তে স্থানীয় গাড়ির মালিকদের যুক্ত করে একটি পরিবহণ সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। পাশাপাশি দূরবর্তী এলাকার গর্ভবতী মহিলাদের জন্য ‘সেফ মাদারহুড হোম’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর মতে, “আসল সমস্যাটি কোথায় তা চিহ্নিত করে, বাস্তবসম্মত, সাশ্রয়ী এবং স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী সমাধান তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।”
জাতীয় গেমস এবং সম্প্রতি নির্মিত ১৬০ কোটি টাকার ইনডোর স্টেডিয়াম-সহ ক্রীড়া পরিকাঠামোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই ধরনের বিনিয়োগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে তরুণ ক্রীড়াবিদদের জীবনে এবং তাঁদের অর্জনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসে তার উপর।
সাঙ্গমা জানান, মেঘালয় এখন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং সামাজিক কল্যাণকে একসঙ্গে যুক্ত করে সমন্বিত প্রশাসনিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এই ভাবনা থেকেই ‘মাদার’ (MOTHER) কর্মসূচির সূচনা হয়েছে, যার পূর্ণরূপ ‘মেঘালয়া আউটকাম অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন ইন হেলথ, এডুকেশন, রুরাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল বেনিফিট’।
তিনি বলেন, “আমরা আর আলাদা আলাদা দফতর বা প্রকল্পের দিকে তাকাচ্ছি না। আমরা একটি মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে ভাবছি এবং জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সরকার কীভাবে সহায়তা করতে পারে তা নির্ধারণ করছি।”
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, গত আট বছরে রাজ্যে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৪,৫০০ থেকে বেড়ে প্রায় ৬০,০০০ হয়েছে, যা মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতায়ন এবং মাতৃ ও শিশুকল্যাণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সহযোগিতামূলক ফেডারেল ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে রাজ্যগুলির একে অপরের কাছ থেকে শেখা উচিত।
তাঁর কথায়, “সুশাসন ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কোনও রাজ্য ছোট বা বড় নয়।”
তিন দিনের এই কর্মশালায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং সরকারি আধিকারিকরা অংশ নিয়েছেন। শিশুদের প্রাথমিক বিকাশ, আচরণবিজ্ঞান, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অভিযোজনমূলক নেতৃত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সেখানে আলোচনা চলছে।
— আইএএনএস



















