আগরতলা, ১০ অক্টোবর (হি. স.) : নেশামুক্ত ভারত গঠনের সাথেই নেশামুক্ত ত্রিপুরা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কোন আপোষ নয়। উত্তর পূর্বাঞ্চল পর্ষদের এমনই কড়া বার্তা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ, জানালেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা। এ-বিষয়ে ত্রিপুরা পুলিশের মহানির্দেশক অমিতাভ রঞ্জন জানিয়েছেন, চলতি মাসেই নারকটিক্স সমন্বয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বিশেষ টিম গঠন করে মাদক পাচারের পুরো চক্রকে নির্মূলের রূপরেখা স্থির করা হবে।
প্রসঙ্গত, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা রাজ্যের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একগুচ্ছ উন্নয়নমূলক প্রকল্প রূপায়ণে কেন্দ্রীয় সরকার ও উত্তর পূর্বাঞ্চল পর্ষদের সার্বিক সহায়তা চেয়েছেন। গত ৮-৯ অক্টোবর গুয়াহাটির আসাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কলেজে উত্তর পূর্বাঞ্চল পর্যদের দু-দিন ব্যাপী ৭০-তম প্ল্যানারি মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা উত্তর পূর্বাঞ্চল পর্ষদের চেয়ারম্যান অমিত শাহ এই প্ল্যানারী মিটিং-এ সভাপতিত্ব করেন। কেন্দ্রীয় উত্তর পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রী জি কিষাণ রেড্ডি সহ পর্ষদের অন্যান্য সদস্যরাও এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও এই বৈঠকে উত্তর পূর্বাঞ্চল রাজ্যগুলির রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রীগণ উপস্থিত ছিলেন।
আজ বিকেলে মহাকরণে সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী উত্তর পূর্বাঞ্চল পর্যদের দু’দিনব্যাপী ৭০তম প্ল্যানারি মিটিংয়ে আলোচনার বিষয়গুলো সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন। সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যসচিব জে কে সিনহা, রাজ্য পুলিশের ডিজিপি অমিতাভ রঞ্জন, পরিকল্পনা দপ্তরের সচিব অপূর্ব রায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, বৈঠকে উত্তর পূর্বাঞ্চল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় যেমন, এসডিজি, ডিস্ট্রিক্ট ইন্ডিকেটর ফ্রেমওয়ার্ক ফর নর্থ ইস্ট, উত্তর পূর্বাঞ্চলে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা, বেসরকারী ক্ষেত্রে বিনিয়োগ (পিপিপি), ৫জি পরিষেবা, ডিজিটাল স্কুল চালু, এন্টারপ্রেনারশীপের উন্নয়ন ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়সমূহ কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের অধিকারিকদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা রাজ্যের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকারের বিষয়গুলি সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের সামগ্রিক বকেয়া বিষয়গুলির দ্রুত সমাধানের জন্য উত্তর পূর্বাঞ্চল পর্ষদ ও ভারত সরকারের গোচরে আনতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ডোনার মন্ত্রকের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও পর্ষদের অন্যান্য সদস্যদের কাছে তুলে ধরেন। এবিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব নেওয়ার পর নয়াদিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারকে উত্তর পূর্বাঞ্চলের দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছেন। উত্তর পূর্বাঞ্চলের শান্তি রক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে গত ৮ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রীর দ্ব্যর্থহীন প্রতিশ্রুতির ফলে এই অঞ্চলের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যসমূহের মধ্যে সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস এবং সবকা প্রয়াস সদর্থক আকার নিচ্ছে। তাঁর কথায়, ত্রিপুরার সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নতি রাজ্য সরকারের মূল অগ্রাধিকারের বিষয়। গত সাড়ে চার বছর ধরে ত্রিপুরা সরকার বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে রাজ্যের আর্থ সামাজিক অবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
এদিন তিনি দাবি করেন, উত্তর পূর্বাঞ্চল পর্যদের দু-দিন ব্যাপী ৭০-তম প্ল্যানারি মিটিংয়ে পর্যটনের মাধ্যমে আর্থিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর কথায়, বর্তমানে প্রতিবছর ৫ লক্ষ দেশ ও বিদেশের পর্যটক রাজ্যে ভ্রমণ করছেন। ত্রিপুরা ট্যুরিজম পলিসি – ২০২০-২৫ রাজ্যে চালু হয়েছে। ত্রিপুরা সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে পর্যটকদের আন্তর্জাতিক মানের পরিকাঠামো ও পরিষেবা প্রদান করা। এই লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের সদর্থক সহায়তা সরকারের এই প্রয়াসকে উজ্জীবিত করবে বলে তিনি বৈঠকে অভিমত ব্যক্ত করেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য সুরক্ষা যোজনার অধীনে দেশের প্রতিটি রাজ্যে একটি এইমস্ স্থাপনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার পরিকল্পনা নিয়েছে। রাজ্যেও এইমসের ধাঁচে একটি হাসপাতাল গড়ে তোলার জন্য জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্রুত এই কাজটি করার জন্য এনইসির বৈঠকে তিনি দাবী জানিয়েছেন। টি বোর্ড, কফি বোর্ড, রাবার বোর্ড এবং স্পাইসেস বোর্ডের মতো আগরতলাকে সদর দপ্তর করে রাজ্যে আগর উড বোর্ড গঠনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে বিবেচনা করার জন্য মুখ্যমন্ত্রী অনুরোধ জানিয়েছেন।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নেশামুক্ত ভারতের পাশাপাশি নেশামুক্ত ত্রিপুরা গড়তে কোন আপোষ করা হবে না, এমনই কড়া বার্তা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর বক্তব্য, মায়ানমার থেকে অসম ও মিজোরাম সীমান্ত অতিক্রম করে ত্রিপুরার উপর দিয়ে মাদক পাচার হচ্ছে বাংলাদেশে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও রাজ্যগুলির সীমান্তে আরও কঠোর নজরদারি বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে অসম, মিজোরাম এবং ত্রিপুরার সীমান্ত লাগোয়া জেলা পুলিশ সুপারদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে মাদক পাচার রোধ করা হোক, এমনই দাবি জানানো হয়েছে।
ত্রিপুরায় সরকার পরিবর্তনের পর ২০১৮ সাল থেকে আগস্ট ২০২২ পর্যন্ত মাদক বিরোধী অভিযানের সাফল্যের বিবরণ এদিন দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, মাদক বিরোধী অভিযানে ১৭৭৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, ২৭০১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, ৬৯৮টি গাড়ি বাজেয়াপ্ত, ১ লক্ষ ৯২ হাজার ৮২৫ কেজি গাঁজা উদ্ধার, ৮ লক্ষ ৮ হাজার ৩৮ বোতল কফ সিরাফ উদ্ধার, ৪৫ লক্ষ ৬৩ হাজার ৫৮১টি ইয়াবা ট্যাবলেট, ১৮ হাজার ৭৩ গ্রাম হিরোইন উদ্ধার হয়েছে এবং ৫ কোটি ৫০ লক্ষ ৫২ হাজার ১৫৩টি গাঁজা গাছ ধ্বংস করা হয়েছে।এ-সম্পর্কে ত্রিপুরা পুলিশের মহানির্দেশক অমিতাভ রঞ্জন বলেন, মাদক পাচারের চক্রকে নির্মূল করতে হবে। তাঁর জন্য চলতি মাসেই নারকটিক্স সমন্বয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে।



















