আগরতলা, ১৯ সেপ্টেম্বর: সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা ফের স্পষ্ট করলেন তিপরা মথার প্রাক্তন সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মণ। তবে রাজনীতি থেকে দূরে গেলেও ত্রিপুরায় থেকেই জনজাতি মানুষের স্বার্থে কাজ করে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, দলীয় পদে থেকে অনেক সময় মানুষের স্বার্থে খোলাখুলি কথা বলা সম্ভব হয় না। তাই রাজনৈতিক পদ-পদবি ছেড়ে মানুষের সঙ্গে সরাসরি থাকার পথ বেছে নিতে চান তিনি।
সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও বার্তায় ত্রিপুরার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রদ্যোত অভিযোগ করেন, রাজ্যের একটি অংশের রাজনীতি সবসময় নেতিবাচকতা, ক্ষোভ ও ক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। তাঁর কথায়, বর্তমান সময়ে বহু রাজনৈতিক নেতা আদর্শ বা নীতির চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে সিপিআই(এম)-এর ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই দলের নেতাদের মধ্যে এখনও কিছুটা আদর্শ, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক নীতির উপস্থিতি দেখা যায়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের দলবদল এবং রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রদ্যোৎত তাঁর দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থানও বদলে যায়। কেন্দ্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে বর্তমানে বিজেপির সঙ্গে থাকা কিছু নেতা সিপিআই(এম)-এর দিকে যেতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের নিয়েও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন প্রদ্যোৎ।
নিজের প্রতিষ্ঠিত দল তিপরা মথাকেও সমালোচনার বাইরে রাখেননি তিনি। দলের নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার প্রভাব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়া অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল বা টিটিএএডিসি প্রশাসনকে ঘিরে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগের প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। প্রদ্যোত বলেন, এসব বিষয়ে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেও তিনি প্রত্যাশিত ফল পাননি। তিপ্রা মথার মুখ হিসেবে এসব ঘটনা তাঁর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিতেও প্রভাব ফেলেছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
তাঁর কথায়, তরুণ প্রজন্ম দেখছে গুয়াহাটি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু ও দিল্লির মতো শহর এগিয়ে যাচ্ছে, অথচ ত্রিপুরার উন্নয়ন নিয়ে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, এই হতাশাকে সরকার ও বিরোধী দল উভয় পক্ষই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর প্রসঙ্গ তুলে প্রদ্যোত বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও কারও জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানো একটি সাধারণ সৌজন্য। কিন্তু তাঁকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য বিরোধী দলের কিছু মানুষ সমালোচনা করেছিলেন। পরে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালে সেই সমালোচনা থেমে যায় বলে দাবি করেন তিনি। একইভাবে রাহুল গান্ধীর জন্মদিনে তিনি শুভেচ্ছা জানালে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করা হয়েছিল বলেও জানান প্রদ্যোত।
তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা দুই দিক থেকেই জনগণকে ব্যবহার করছেন, কারণ আপনাদের কাছে ভোট আছে। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষা, জনজাতির অধিকার, স্বাস্থ্য, রাস্তা ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক বিষয় নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষকে একসঙ্গে বসে ত্রিপুরার স্বার্থে কাজ করা উচিত।
নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রদ্যোত জানান, ভিলেজ কমিটি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর আগামী মাসে তিপরা মথার প্লেনারি অধিবেশন ডাকবেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীও যে আগামী মাস থেকে ত্রিপুরা অ্যাকর্ড বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করার কথা বলেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মনে করছেন সক্রিয় রাজনীতিতে তাঁর আর থাকা উচিত নয়।
তিনি বলেন, আমি ত্রিপুরায় থাকব, মানুষের পিছনে থাকব। কিন্তু আমার মনে হয়, আমি যখন পার্টিতে থাকি, তখন পার্টি এবং মানুষের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে কখনও কখনও আমার কষ্ট হয়।
তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক পদে থাকলে কোনও নেতা ভুল করলে অনেক সময় প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা করতে অসুবিধা হয়। কিন্তু দলীয় পদ ছেড়ে দিলে তিনি মানুষের পাশে থেকে কোনও ভুল কাজের বিরুদ্ধে আরও স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবেন।
এদিন তিনি আরও বলেন, তিপরা মথা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অর্থ উপার্জনের জন্য নয়। জনজাতি মানুষের দুরবস্থা দেখে রাজনীতিতে এসেছিলেন। কংগ্রেসে থাকার সময় ব্রু এলাকা, ডম্বুর, মাধববাড়ি এবং আগরতলার বিভিন্ন জায়গায় মানুষের পরিস্থিতি দেখে তিনি রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান।
তাঁর কথায়, আমার ক্ষমতা তিপরা মথা নয়। আমার ক্ষমতা হচ্ছে তোমাদের বুবাগ্রা হওয়া, এমন একজন, যাকে তোমরা বিশ্বাস কর এবং ভালোবাসো।তিনি আরও বলেন, তাঁর রাজনৈতিক পদ ছেড়ে দেওয়ার অর্থ মানুষের কাছ থেকে সরে যাওয়া নয়। বরং তাঁর কাজের পদ্ধতি বদলাবে, কিন্তু ত্রিপুরাসাদের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্য একই থাকবে।



















