ইম্ফল, ১৪ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): মণিপুরের তামেংলং ও নোনি জেলায় পৃথক হামলায় দুই মহিলা-সহ চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় কড়া পদক্ষেপের আশ্বাস দিলেন রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনথৌজম গোবিন্দ সিং। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনও ধরনের হিংসাত্মক ঘটনা মণিপুরের শান্তি ও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফেরার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না।
ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিরীহ মানুষের প্রাণহানিতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, নিরীহ নাগরিকদের উপর হিংসা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
এক বিবৃতিতে গোবিন্দ সিং বলেন, ঘটনার প্রকৃত তথ্য নির্ধারণ, দায়ীদের শনাক্ত করা এবং কোনও ভয় বা পক্ষপাত ছাড়াই আইনের আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই হিংসার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের আইনের ভিত্তিতে খুঁজে বের করে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কোনও হিংসাত্মক ঘটনা মণিপুরের শান্তি ও স্বাভাবিকতার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না বলেও তিনি জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আইনের শাসন বজায় থাকবে, ন্যায়বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং শান্তি রক্ষা করা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, তামেংলং জেলার কাইমাই থানার অধীন টোলেন কুকি গ্রামে হামলায় এক মহিলা-সহ দু’জন নিহত হন। অন্যদিকে, নোনি জেলার নুংবা থানার অধীন লংপি গ্রামে আরও দু’জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন মহিলা ছিলেন। চার নিহতই কুকি জনজাতি সম্প্রদায়ের সদস্য বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হামলার পরপরই নিরাপত্তা বাহিনী অভিযুক্তদের খুঁজে বের করতে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রী ইয়ুমনাম খেমচাঁদ সিংও রবিবার এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করেন এবং নিরীহ মানুষের প্রাণহানিতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য, নিরীহ নাগরিকদের বিরুদ্ধে এই ধরনের কাপুরুষোচিত হিংসার কোনও স্থান সমাজে নেই।
এদিকে, কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের বিধায়ক ও বিভিন্ন সংগঠনও হামলার নিন্দা করেছে। কাইমাই ভিলেজ অথরিটি-সহ একাধিক সংগঠন টোলেনের ঘটনাকে সম্প্রদায়গুলির মধ্যে বিভাজন ও অশান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে করা ‘পরিকল্পিত ও বিদ্বেষপূর্ণ’ প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করেছে।
এরই মধ্যে জিরিবাম জেলার জিরিবাম থানার অধীন খেদাঘর এলাকায় রবিবার সন্ধ্যায় রংমেই নাগা সম্প্রদায়ের সদস্যদের তিন থেকে চারটি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় এখনও কোনও হতাহত হওয়ার খবর নেই। জিরিবাম থানা থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানা গিয়েছে।
সূত্রের দাবি, কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কায় রংমেই নাগা পরিবারগুলি কয়েক সপ্তাহ আগেই ওই বাড়িগুলি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ঘটনার পর নিরাপত্তা বাহিনী এলাকায় পৌঁছে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করে। বাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে এবং দ্রুত মোতায়েনের জন্য সেনা ও কুইক অ্যাকশন টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে স্থানীয় বাসিন্দা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। আগুন লাগার সঠিক কারণ এবং এর পিছনে কারা রয়েছে, তা এখনও সরকারি ভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
এদিকে, কুকি-জো জনজাতি সম্প্রদায়ের শীর্ষ সংগঠন কুকি-জো কাউন্সিল (কেজেডসি) লি. টোলেন ও লংপি গ্রামে দুই মহিলা-সহ চার কুকি-জো নাগরিকের হত্যার তীব্র নিন্দা করেছে। সংগঠনের মুখপাত্র তথা তথ্য ও প্রচার সচিব গিনজা ভুয়ালজং অভিযোগ করেন, মণিপুরে কুকি-জো নাগরিকদের বিরুদ্ধে হিংসা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
কেজেডসি দাবি করেছে, নাগা নেতৃত্ব ও নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির ভূমিকা নিয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সংগঠনটির অভিযোগ, ২০২৬ সালের শুরু থেকে নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় মহিলা ও শিশু-সহ ২২ জন কুকি-জো নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই দাবির পাশাপাশি নাগা-কুকি-জো হিংসা বন্ধ করতে অর্থবহ আলোচনা ও পুনর্মিলনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে তারা।
কেজেডসি আরও অভিযোগ করেছে, হামলায় এনএসসিএন-আইএম ক্যাডারদের পাশাপাশি জেডইউএফ-কে এবং নাগা ভিলেজ গার্ডদের জড়িত থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সংগঠনটি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এ বিষয়ে দৃঢ় পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে এবং মণিপুরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির কার্যকলাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
—আইএএনএস



















