আগরতলা, ৫ সেপ্টেম্বর: ত্রিপুরায় ৭২ ঘণ্টার সড়ক ও রেল অবরোধকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানাল ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস। শনিবার এক প্রেস বিবৃতিতে দলের মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তী অভিযোগ করেন, গত সাড়ে আট বছরে রাজ্যের ‘ট্রিপল ইঞ্জিন’ সরকার আইনের শাসন, প্রশাসনিক নিয়ম মেনে চলা এবং জনকল্যাণমূলক কাজে সরকারি অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
কংগ্রেসের অভিযোগ, সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে কাগুজে সিদ্ধান্ত, বিজ্ঞাপনী প্রচার ও আত্মপ্রচার। এর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্ষমতা ধরে রাখার নানা কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়।
প্রেস বিবৃতিতে থানায় বসে আধিকারিকদের বিরুদ্ধে সাড়ে তিন কেজি সোনা লুটের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেস প্রশ্ন তোলে, আদালতের হস্তক্ষেপের পরেই কেন ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। একইসঙ্গে ব্যবসা করতে গিয়ে এক ব্যক্তির গণপিটুনিতে মৃত্যুর অভিযোগের পরও কোনও অভিযুক্ত গ্রেফতার না হওয়ার ঘটনা নিয়েও রাজ্য সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করা হয়।
সম্প্রতি তথাকথিত আত্মসমর্পণকারী প্রাক্তন উগ্রপন্থীদের একটি অংশের ডাকা ৭২ ঘণ্টার অবরোধ নিয়ে কংগ্রেসের বক্তব্য, চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে বারবার রাস্তা অবরোধ করে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগের মুখে ঠেলে দেওয়া নতুন ঘটনা নয়। দলটির প্রশ্ন, যে ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সম্মতি রয়েছে, সেটি আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যকর করা হচ্ছে না কেন?
কংগ্রেসের অভিযোগ, অবরোধের জেরে রেল ও সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি বিমান পরিষেবাতেও যাত্রীরা সমস্যায় পড়েছেন। জরুরি চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজেও বিঘ্ন ঘটেছে।
একটি নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করে প্রবীর চক্রবর্তী জানান, এক মহিলা যাত্রীর বাবা বেঙ্গালুরুর একটি হাসপাতালে সংকটজনক অবস্থায় ছিলেন। তাঁকে দেখতে এবং চিকিৎসায় সহায়তা করতে ওই মহিলার বেঙ্গালুরু যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অবরোধের কারণে তিনি নির্ধারিত দিনে সেখানে পৌঁছাতে পারেননি বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রদেশ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, আসন্ন ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে রাজ্যের বিশেষ করে এডিসি এলাকার আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা হতে পারে। এমনকি অবরোধের পিছনে রাজ্যে জাতিগত সমস্যা ও সংঘাত সৃষ্টির কোনও চক্রান্ত রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে।
মণিপুরের দীর্ঘস্থায়ী হিংসা এবং সম্প্রতি মেঘালয়ের শিলংয়ে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনাগুলির উল্লেখ করে কংগ্রেস দাবি করে, এই ধরনের পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ত্রিপুরা সরকারের আরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।
প্রদেশ কংগ্রেস প্রশ্ন তুলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে আত্মসমর্পণকারী হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিরা আসলে কারা এবং তাঁদের সংখ্যা কত? রাজ্যের বিভিন্ন থানায় তাঁদের বিরুদ্ধে কী কী মামলা ছিল, সেই তথ্যও প্রকাশ্যে আনার দাবি জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে দাবি করা হয়, টিএনভি, এটিটিএফ এবং এনএলএফটি-র বিভিন্ন গোষ্ঠীর অধিকাংশ সদস্য আত্মসমর্পণের পর রাজ্যে উগ্রপন্থী কার্যকলাপ কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ২০১৮ সালের পরও কিছু উগ্রপন্থী আত্মসমর্পণের পর ত্রিপুরাকে ‘উগ্রপন্থীমুক্ত রাজ্য’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করে কংগ্রেস।
পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহার আমলে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তির আত্মসমর্পণ এবং তাঁদের জন্য বড় আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণার প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেসের অভিযোগ, আত্মসমর্পণকারীরা অল্প কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিয়েছিলেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলির বিস্তারিত তথ্যও স্বরাষ্ট্র দপ্তর স্পষ্ট করতে পারেনি।
ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচন ঘোষণার পরও স্কুলের পরীক্ষাসূচি পরিবর্তন না করায় শিক্ষা দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে প্রদেশ কংগ্রেস। দলের দাবি, নির্বাচনের আগে, ভোটের দিন এবং গণনার দিনেও নির্ধারিত পরীক্ষার সূচি রয়েছে। নির্বাচন ঘোষণার পাঁচ দিন পার হয়ে গেলেও শিক্ষা দপ্তর এখনও পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি।
একে সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি অবহেলার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনা করে। শেষে প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনের যে অংশ এখনও সংবিধান ও রাজ্যবাসীর প্রতি দায়বদ্ধ, তাদের অবিলম্বে শান্তিপূর্ণভাবে সড়ক ও রেল অবরোধ মুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি রাজ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও গণতন্ত্র রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রাজ্যবাসীর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ও ঐক্যবদ্ধ গণপ্রতিরোধ আন্দোলন শক্তিশালী করার জন্যও প্রদেশ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে।



















