নয়াদিল্লি, ১০ আগস্ট (আইএএনএস): কোনও নারী কী পোশাক পরবেন, তা তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দ। সমাজ, প্রতিবেশী বা অন্য কোনও ব্যক্তির সেই পোশাক নিয়ে নির্দেশ দেওয়ার অধিকার নেই। সোমবার একটি যৌন হেনস্থার মামলায় অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করার সময় এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল দিল্লি হাইকোর্ট।
বিচারপতি চন্দ্রশেখরন সুধার একক বেঞ্চ খালাস পাওয়া অভিযুক্তের বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করে তাঁকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪এ(১)(i) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে। মামলাটি এক তরুণীকে বারবার অনুসরণ করা, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা এবং তাঁর গাল ও কোমরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার অভিযোগ সংক্রান্ত।
মামলার শুনানিতে ওই নারীর পোশাক, বিশেষ করে তিনি জিন্স পরতেন কি না, তা নিয়ে সওয়াল করায় আদালত তীব্র আপত্তি জানায়।
বিচারপতি সুধা বলেন, ‘‘কোনও মেয়ে বা নারী কী পোশাক পরবেন, তা তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ। তাঁর প্রতিবেশী, সমাজ, অভিযুক্ত কিংবা আদালতে উপস্থিত কোনও আইনজীবীরও তাঁর পোশাক নির্ধারণ করার অধিকার নেই।’’
ট্রায়াল চলাকালীন প্রতিরক্ষা পক্ষ ওই নারীর পোশাক এবং পশ্চিমী পোশাক পরা নিয়ে এলাকার বাসিন্দাদের আপত্তির বিষয়টি তুলে প্রশ্ন করেছিল। ওই নারী জানিয়েছিলেন, তিনি সাধারণত ‘‘সাধারণ জিন্স ও টপ’’ পরেন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁর পোশাক নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
এই ধরনের জেরা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও অনুচিত বলে মন্তব্য করে দিল্লি হাইকোর্ট জানায়, ওই প্রশ্নের মাধ্যমে অভিযোগকারিণীকে বিব্রত, অপমান এবং নৈতিকভাবে বিচার করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
আদালত স্পষ্ট জানায়, ‘‘একজন নারীর পোশাকের পছন্দ তাঁর মর্যাদা কমায় না এবং তাঁর বিরুদ্ধে বেআইনি আচরণের কোনও যুক্তি বা অনুমোদন হিসেবেও তা ব্যবহার করা যায় না।’’
নারীর কীভাবে পোশাক পরা উচিত—এমন পশ্চাদপদ ধারণার ভিত্তিতে করা প্রশ্নের আদালতে কোনও স্থান নেই বলেও জানায় বেঞ্চ। এই ধরনের প্রশ্নকে কোনওভাবেই চরিত্রহনন বা অভিযোগকারিণীকেই দোষী করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
ওই নারীর জিন্স পরা ‘‘তরুণ ছেলেদের বিপথে নিয়ে যেতে পারে’’—প্রতিরক্ষা পক্ষের এমন যুক্তিও খারিজ করে আদালত। বিচারপতি সুধা বলেন, সমাধান মেয়েদের ও নারীদের পোশাক নিয়ন্ত্রণে নয়। বরং বাবা-মা ও সমাজকে শিশুদের নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান করা এবং বাড়ি ও বাইরে প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা রক্ষা করার শিক্ষা দিতে হবে।
মামলায় ধর্ম ও স্থানীয় রীতিনীতির প্রসঙ্গ তোলারও সমালোচনা করে আদালত। প্রতিরক্ষা আইনজীবী দাবি করেছিলেন, প্রত্যেক এলাকার নিজস্ব রীতি ও প্রথা রয়েছে এবং সবাইকে তা মেনে চলতে হয়। আদালত এই যুক্তিকে ‘‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’’ বলে জানায়।
বিচারপতি সুধা বলেন, ওই নারীর ধর্ম, এলাকার বাসিন্দাদের ধর্ম এবং তাঁর পোশাক—কোনওটির সঙ্গেই আদালতের সামনে থাকা মূল অভিযোগের কোনও সম্পর্ক নেই। ধর্ম বা স্থানীয় রীতিকে ব্যবহার করে কোনও বেআইনি আচরণকে ন্যায্যতা দেওয়া বা কোনও নারীর ব্যক্তিগত পছন্দের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা যায় না।
আদালত আরও উল্লেখ করে, অভিযুক্ত ও এলাকার কিছু বাসিন্দার করা অভিযোগে ওই নারীর ‘‘অপরাধ’’ হিসেবে মায়ের সঙ্গে বাড়িতে থাকা, পরিবারের কোনও পুরুষ সদস্য না থাকা, ‘‘আপত্তিকর পোশাক’’ পরা এবং সেই পোশাকের মাধ্যমে এলাকার তরুণ ছেলেদের বিপথে নিয়ে যাওয়ার মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কেন তদন্ত শুরু করেছিল, তা নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করে আদালত। বিচারপতি সুধা বলেন, দেশের প্রচলিত কোনও আইন, বিধি বা আইনি বিধানের এমন কোনও ধারা তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না, যা ওই নারীর বিরুদ্ধে কোনও অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
আদালতের মতে, অভিযুক্ত ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মূল আপত্তি ছিল ওই নারীর পোশাক নিয়ে। তাঁর পোশাকের কারণে তাঁর সাক্ষ্যকে অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই বলেও জানায় বেঞ্চ।
এমনকি কোনও নারীকে ‘‘সহজলভ্য চরিত্রের’’ বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হলেও তাঁর গোপনীয়তা ও আইনি সুরক্ষার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে বলে আদালত স্পষ্ট করে।
মামলায় ওই নারীর সাক্ষ্যকে ধারাবাহিক ও বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেছে আদালত। অভিযুক্তের অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শ এবং তাঁর মন্তব্যকে একত্রে বিবেচনা করে আদালত ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪এ(১)(i) ধারায় যৌন হেনস্থার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলে জানায়।
সেই অনুযায়ী অভিযুক্ত সাজিদ আলিকে যৌন হেনস্থার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সাজা নির্ধারণের শুনানির জন্য তাঁকে বুধবার দিল্লি হাইকোর্টে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে বিচারপতি সুধা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদেরও সতর্ক করে বলেন, জেরা কোনও সাক্ষীকে অপমান, লজ্জিত, ভয় দেখানো বা হয়রানি করার লাইসেন্স হতে পারে না। ‘‘জেরার আড়ালে কোনও সাক্ষীর মর্যাদার উপর আঘাত করা হলে আদালত নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না’’ বলেও মন্তব্য করে আদালত।
কোনও মামলার সঙ্গে সরাসরি প্রাসঙ্গিক না হলে নারীর পোশাক, চরিত্র, জীবনযাপন, ধর্ম বা ব্যক্তিগত পছন্দ নিয়ে প্রশ্ন জেরায় অনুমোদন করা উচিত নয় বলে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
এই রায়ের একটি অনুলিপি দিল্লির সমস্ত প্রিন্সিপাল ডিস্ট্রিক্ট অ্যান্ড সেশনস জজের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে তা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের মধ্যে প্রচার করা যায়। পাশাপাশি উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সংবেদনশীলতা কর্মসূচির জন্য রায়ের অনুলিপি দিল্লি জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমির ডিরেক্টর (অ্যাকাডেমিক্স)-এর কাছেও পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
______


















