ইম্ফল, ৮ আগস্ট (আইএএনএস): মণিপুরে শান্তি ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে বড় পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। শনিবার মুখ্যমন্ত্রী যুমনাম খেমচাঁদ সিং, তাঁর মন্ত্রিসভার সহকর্মী এবং আদিবাসী নেতারা যৌথভাবে রাজ্যের জাতীয় সড়কগুলি অবিলম্বে খুলে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। এর ফলে সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষের অবাধ যাতায়াত এবং অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হল।
মুখ্যমন্ত্রী উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপগেন এবং নির্দল বিধায়ক হাওখোলেট কিপগেনকে সঙ্গে নিয়ে কুকি-জো অধ্যুষিত কাংপোকপি জেলা সদর পরিদর্শন করেন এবং সেখানে বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পুনর্মিলনের চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই মুখ্যমন্ত্রীর এই সফর বলে জানানো হয়েছে।
মণিপুরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হল ইম্ফল-জিরিবাম জাতীয় সড়ক এবং ইম্ফল-ডিমাপুর জাতীয় সড়ক। ২০২৩ সালের ৩ মে জাতিগত হিংসা শুরু হওয়ার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ঘন ঘন অবরোধের কারণে এনএইচ-2-এ যাতায়াত ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়ে আসছিল।
কাংপোকপি জেলা সদর যাওয়ার পথে গামগিফাই এলাকার গ্রামবাসীরা মুখ্যমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। সফরকালে মুখ্যমন্ত্রী একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন করেন এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের আওতায় উপভোক্তাদের হাতে সুবিধা তুলে দেন।
প্রকল্প উদ্বোধনের সময় খেমচাঁদ সিং মণিপুরের প্রায় ৩,০০০ বছরের ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেন। উনিশ শতকের ‘সেভেন ইয়ার্স ডেভাস্টেশন’-কে রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম করুণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমস্ত সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মণিপুরের সীমানা গড়ে উঠেছে এবং সুরক্ষিত হয়েছে। রাজ্যের ভূখণ্ড রক্ষায় সব সম্প্রদায়ের মানুষই ত্যাগ স্বীকার করেছেন বলেও জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন সম্প্রদায়কে পরস্পরের প্রতি আস্থা ও সহযোগিতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মানুষকে প্রথমে নিজেদের ভারতীয় এবং তার পর মণিপুরি হিসেবে ভাবতে হবে। তাঁর মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন ছাড়া ভারতের উন্নয়ন সম্পূর্ণ হতে পারে না এবং কাংপোকপির উন্নয়ন ছাড়া মণিপুরের উন্নয়নও সম্পূর্ণ হবে না।
কাংপোকপি জেলা সদর হাসপাতালে ডায়ালিসিস ইউনিট উদ্বোধনের সময় মুখ্যমন্ত্রী বাইবেলের একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরে ক্ষমা ও পুনর্মিলনের বার্তা দেন। রাজ্যের চলমান দুই ধরনের সংঘাতকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলেও জানান তিনি।
এদিন কাংপোকপি জেলা হাসপাতালকে ১০০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি সিটি স্ক্যান পরিষেবা, মোটবুং এবং টি ওয়াইচং-এ নতুন প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সাইকুলের কমিউনিটি হেলথ সেন্টারকে উন্নত করার কথাও জানান তিনি।
এছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, নতুন ক্রীড়া পরিকাঠামো, সিটি কনভেনশন হল কাম গেস্ট হাউস এবং একটি পৃথক কম্পিউটারাইজড পরীক্ষা কেন্দ্র তৈরির ঘোষণাও করেন মুখ্যমন্ত্রী।
কাংপোকপি কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক তথা উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপগেন এই দিনটিকে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেন। উপত্যকা ও পাহাড়ি এলাকায় সমান উন্নয়নের উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ উন্নয়নের জন্য দুই অঞ্চলেরই সমান অগ্রগতি প্রয়োজন। শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের সহযোগিতার আবেদন জানান তিনি।
বিধায়ক হাওখোলেট কিপগেন বলেন, চার বছর পর সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করতে পেরে তিনি আনন্দিত। অতীতের তিক্ততা ভুলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য তিনি সব সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে আবেদন জানান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই NH-2 মণিপুরের সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষের লাইফলাইন হিসেবে কাজ করে আসছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মুখ্যমন্ত্রীর সফরকালে কাংপোকপির কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে একটি ডায়ালিসিস ইউনিট এবং কাংপোকপি জেলা হাসপাতালে একটি জেলা ব্লাড স্টোরেজ কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়। মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের হাতে অ্যাম্বুল্যান্সও তুলে দেওয়া হয়।
এদিন প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা, টিবি মুক্ত ভারত, মিশন বাত্সল্য, পিএম-কিষান, পিএম সূর্য ঘর এবং পিএম-কুসুমের মতো বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধাও উপভোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। কৃষি স্প্রেয়ার, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষ ও ডায়ালিসিস রোগীদের জন্য চেক এবং সৌর পাম্পও তুলে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্য অর্জনকারী দুই তরুণ ক্রীড়াবিদকে সংবর্ধনা জানানো হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিক বিধায়ক ও শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কমিশনার (স্বরাষ্ট্র), কমিশনার (স্বাস্থ্য), বিভিন্ন দফতরের প্রধান এবং ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান আনতাস খান।
জাতীয় সড়ক খুলে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে মণিপুরে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে মানুষের অবাধ চলাচল, প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ এবং শান্তি ও স্বাভাবিকতা ফেরানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।



















