অযোধ্যা, ৬ জুলাই (আইএএনএস) : অনুদান তছরুপের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কের জেরে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ বৈঠকে শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট সোমবার গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই এবং ট্রাস্টি অনিল মিশ্রের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় বন পরিষেবা (আইএফএস) কর্মকর্তা কৃষ্ণ মোহনকে অন্তর্বর্তী সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে, যিনি আপাতত রামমন্দিরের দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাবেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিক বৈঠকে ট্রাস্টের কোষাধ্যক্ষ গোবিন্দ দেব গিরি বলেন, অনুদান চুরির ঘটনা অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং এটি ট্রাস্ট ও ভগবান রামের ভক্তদের গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই ট্রাস্ট সদস্যরা পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য বৈঠকে বসেন।
তিনি জানান, চম্পত রাই নিজেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মতে, অনুদান তছরুপ মামলার অভিযুক্তদের গ্রেফতার ও শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর পদে বহাল থাকা সমীচীন হবে না।
গোবিন্দ দেব গিরি আরও জানান, ট্রাস্টের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো পদাধিকারীর পদত্যাগপত্র জমা পড়লে তা অবিলম্বে গ্রহণ করতে হয়। জ্যেষ্ঠ ট্রাস্টি কে. পরাসরন এই বিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার পরই চম্পত রাই ও অনিল মিশ্রের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়।
তিনি বলেন, ট্রাস্ট গঠনের শুরু থেকে রামমন্দির নির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ে চম্পত রাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং তাঁর অবদান ট্রাস্ট শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে কোষাধ্যক্ষ বলেন, সামাজিক মাধ্যমে রামমন্দির থেকে বহু ধর্মীয় নিদর্শন হারিয়ে যাওয়ার যে দাবি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। তাঁর দাবি, ট্রাস্টের কাছে প্রায় ২,৮০০টি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের যথাযথ নিবন্ধিত তালিকা রয়েছে, যার মধ্যে রামায়ণ এবং চরণপাদুকার মতো মূল্যবান সামগ্রীও অন্তর্ভুক্ত। সব নিদর্শনই নিরাপদ রয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
এই সিদ্ধান্তকে চলমান বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। রামমন্দির পরিচালনায় জনআস্থার ওপর যে প্রশ্ন উঠেছে, তা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই ট্রাস্ট প্রশাসনিক সংস্কারের পথে এগোচ্ছে।
মহন্ত নৃত্য গোপাল দাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিশ্বপ্রসন্নতীর্থ, স্বামী পরমানন্দ গিরি-সহ অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ট্রাস্টের সংবিধান অনুযায়ী নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ গ্রহণের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বের পথ সুগম করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, কৃষ্ণ মোহনই সেই ব্যক্তি যাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করে। তাঁকে সম্প্রতি ট্রাস্টি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং এখন তিনি অন্তর্বর্তী দায়িত্বে নিযুক্ত হলেন।
গত জুন মাসে অনুদান গণনায় অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। উত্তর প্রদেশ সরকারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) প্রাথমিক তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। সেই ভিত্তিতে ২৫ জুন ২০২৬ রাম জন্মভূমি থানায় কৃষ্ণ মোহনের অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের হয়।
এফআইআরে মোট আটজনের নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন চম্পত রাইয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও চালক টিন্নু যাদব (রামাশঙ্কর যাদব), অবিনাশ শুক্ল, অনুকল্প মিশ্র, লাভকুশ মিশ্র, মনীশ কুমার যাদব, করুণেশ পাণ্ডে, রামাশঙ্কর মিশ্র এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা সুভাষ শ্রীবাস্তব। পুলিশ দ্রুত অভিযানে আটজনকেই গ্রেফতার করেছে। তাঁদের সম্পত্তি, আর্থিক লেনদেন ও জমি সংক্রান্ত বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে নগদ অর্থ, সোনা, রুপো এবং ভক্তদের অন্যান্য দানের সামগ্রী আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন ব্যাংকে বহু বছরের আর্থিক লেনদেনের তথ্যও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকেই অনুদান তছরুপ হয়ে থাকতে পারে। ট্রাস্টের প্রাক্তন হিসাবরক্ষণ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিপাল সিং দাবি করেছেন, তিনি আগেই চম্পত রাই-সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন, কিন্তু অভিযোগের গুরুত্ব না দিয়ে তাঁকেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
যদিও এখনও পর্যন্ত চম্পত রাই, অনিল মিশ্র বা ট্রাস্টের অন্য কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়নি।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। ২০২৪ সালে উদ্বোধনের পর দেশ-বিদেশের কোটি কোটি ভক্তের অনুদানে পরিচালিত রামমন্দিরে এই ঘটনার পর জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ট্রাস্ট জানিয়েছে, তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে। মোট ৩,২৬৪ কোটি টাকা অনুদান ও কর্পাস তহবিল হিসেবে প্রাপ্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২,৩৭০ কোটি টাকা মন্দির নির্মাণ ও মূলধনী ব্যয়ে খরচ করা হয়েছে। এছাড়া ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত প্রণামী বাবদ ৫৮২ কোটি টাকা এসেছে, যার মধ্যে ৩৯১ কোটি টাকা পরিচালন ব্যয়ে ব্যয় হয়েছে এবং অবশিষ্ট অর্থ ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষিত রয়েছে।
সোমবারের সাংবাদিক বৈঠকে ট্রাস্ট জানায়, প্রতি বছর নিয়মিত অডিট ও আর্থিক যাচাই করা হয়।
অবসরপ্রাপ্ত আইএফএস কর্মকর্তা কৃষ্ণ মোহনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়েই তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে ট্রাস্টের দাবি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ, প্রশাসনিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং অনুদান ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর প্রোটোকল চালুর কথাও জানানো হয়েছে।
আগামী ২২ জুলাই ট্রাস্টের পরবর্তী বৈঠকে এসআইটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা হবে। সেই সময় আরও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
তদন্ত এখনও চলছে। নতুন প্রমাণ মিললে আরও গ্রেফতার বা অতিরিক্ত অভিযোগ আনার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
বর্তমানে প্রতিদিন লক্ষাধিক ভক্তের আগমন হওয়ায় রামমন্দিরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ট্রাস্টের প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানানো হয়েছে। অনুদানের ডিজিটাল নজরদারি, নিরাপত্তা জোরদার এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে ভক্তদের আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
























