নয়াদিল্লি, ২ জুলাই: ভারত-জাপান বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচীর সঙ্গে যৌথ প্রেস বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকাইচীর প্রথম ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে। তিনি জানান, ভারত ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থা, বন্ধুত্ব ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সহযোগিতার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, বর্তমান অস্থির বিশ্ব পরিস্থিতিতে পারস্পরিক আস্থাই সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ। ভারত ও জাপানের সম্পর্ক সেই আস্থার ওপরই প্রতিষ্ঠিত এবং গত কয়েক দশক ধরে জাপান ভারতের উন্নয়নযাত্রায় অন্যতম নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে।
তিনি বলেন, অবাধ, সমৃদ্ধ এবং নিয়মভিত্তিক ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে দুই দেশ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক ও বাজারভিত্তিক অর্থনীতি হিসেবে ভারত ও জাপান শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য যৌথভাবে কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রযুক্তি সহযোগিতাকে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এআই প্রতিষ্ঠান জাপানি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। জাপানের উন্নত প্রযুক্তি এবং সফটওয়্যার ক্ষেত্রে ভারতের দক্ষতার সমন্বয় বিশ্বব্যাপী এআই বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বড় অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত ও জাপানের মধ্যে প্রথম যৌথ প্রতিরক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নৌবাহিনীর রেডিও অ্যান্টেনা সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হবে।
তিনি জানান, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং জৈবপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে স্বাক্ষরিত একাধিক চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ভারতের উৎপাদন সক্ষমতা এবং জাপানের উচ্চমানের প্রযুক্তির সমন্বয়ে সাশ্রয়ী ও উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত এক বছরে ভারত ও জাপানের মধ্যে ১০০টিরও বেশি নতুন বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে। এর ফলে ভারতে জাপানি সংস্থাগুলির ১০০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত হয়েছে। আগামী ১০ বছরে ভারতে ১ লক্ষ কোটি ইয়েন বিনিয়োগ এবং দেশে জাপানি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আর্থিক নিরাপত্তা ও সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করতে দুই দেশ একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেমিকন্ডাক্টর, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও উপাদানের সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত-জাপান বায়োগ্যাস উদ্যোগের আওতায় ভারতে ১,০০০টি বায়োগ্যাস ও জৈব সার উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে জাপান সহযোগিতা করবে। এছাড়াও ব্যাটারি প্রযুক্তি, সবুজ হাইড্রোজেন এবং পারমাণবিক শক্তির মতো পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হবে।
তিনি জানান, ‘ভারত-জাপান নেক্সট জেনারেশন মোবিলিটি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক’-এর মাধ্যমে যানবাহন শিল্প, জাহাজ নির্মাণ, বিমান পরিবহণ এবং লজিস্টিকস ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে নিবিড় সম্পর্কই এই অংশীদারিত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি। দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, শিক্ষা, স্টার্টআপ এবং প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা আরও বাড়ানো হবে। আগামী বছর ভারত-জাপান কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সংস্কৃতি, পর্যটন এবং সৃজনশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রেও যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভাষণের শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত ও জাপানের অর্থনীতি পরস্পরের পরিপূরক এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতেই দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ জাপান এবং একটি উন্নত ভারতের লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি বিশ্বের উন্নয়ন ও শান্তির স্বার্থে দুই দেশ একযোগে কাজ করে যাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।



















