নয়াদিল্লি, ৮ জুন (আইএএনএস): দিল্লির সাকেত এলাকার সাইদুলাজাবে বেআইনিভাবে নির্মিত পাঁচতলা একটি ভবন ধসে ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনাকে সুপ্রিম কোর্টের নজরে আনলেন আদালত-নিযুক্ত অ্যামিকাস কিউরি তথা প্রবীণ আইনজীবী অজিত কুমার সিনহা। একই সঙ্গে রাজধানীতে বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জিও জানিয়েছেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া একটি স্ট্যাটাস রিপোর্টে অ্যামিকাস কিউরি উল্লেখ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা অননুমোদিত নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতির ফলেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিল্ডিং বিধি এবং ভূমি ব্যবহারের নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে চলা মামলার শুনানি করছে শীর্ষ আদালত।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাইদুলাজাবের ওয়েস্টার্ন মার্গে অবস্থিত ২৬১ নম্বর সম্পত্তিতে বহু বছর ধরেই বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ ছিল। পুরসভার নথি অনুযায়ী, ২০১২ সালে বেসমেন্ট, গ্রাউন্ড ফ্লোর এবং প্রথম তলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পরে ২০১৫ সালে বেআইনিভাবে নির্মিত দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলাও চিহ্নিত করা হয়।
অ্যামিকাস কিউরির দাবি, সম্প্রতি চতুর্থ ও পঞ্চম তলা নির্মাণ করা হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত নির্মাণই ভবন ধসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অভিযোগ, একাধিকবার বেআইনি নির্মাণ ধরা পড়লেও দিল্লি পুরনিগম (এমসিডি) কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘‘নিয়মভঙ্গের বিষয়ে বারবার অবহিত করা হলেও কর্পোরেশন তাদের আইনগত দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি চতুর্থ ও পঞ্চম তলা নির্মাণের সময়ও ভবনটি সিল বা অন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’’
অ্যামিকাস কিউরি আরও জানান, এই বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়টি একাধিকবার দিল্লি হাইকোর্টেও উঠেছিল। ২০২০ সালে ভবনের মালিক হাইকোর্টে আবেদন করে অভিযোগ করেন যে, দক্ষিণ দিল্লি পুরসভা নোটিস না দিয়েই ভবন ভাঙার উদ্যোগ নিচ্ছে। তখন হাইকোর্ট পুরসভাকে মালিকের বক্তব্য শোনার নির্দেশ দেয়।
পরবর্তীতে বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া আরেকটি মামলাও নিষ্পত্তি হয়, কারণ পুরসভা আদালতে জানিয়েছিল যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এছাড়া চলতি বছরের শুরুতে আব্দুল শাকির নামে এক ব্যক্তি সাইদুলাজাবে বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন। সেই মামলায় এমসিডির আইনজীবী আদালতকে জানিয়েছিলেন যে, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিতে কোনও নির্মাণকাজ চলছে না এবং বিষয়টি মূলত ব্যক্তিগত বিরোধের।
অ্যামিকাস কিউরির অভিযোগ, এই ‘ভুল তথ্যের’ ভিত্তিতেই মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। অথচ তার দু’মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ভবনটি ধসে পড়ে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের পরও বেআইনি নির্মাণ অব্যাহত থাকা থেকে স্পষ্ট যে নির্মাণবিধি কার্যকর করার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ করে ছিলেন। দুর্ঘটনার পর এক সহকারী ইঞ্জিনিয়ার ও এক জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ারকে সাসপেন্ড করা হলেও, সেটিকে তিনি ‘‘ঘটনার পর জনরোষ সামলানোর জন্য নেওয়া কসমেটিক পদক্ষেপ’’ বলে উল্লেখ করেছেন।
অ্যামিকাস কিউরি সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেরও উল্লেখ করেন, যেখানে আদালত জানিয়েছিল যে দিল্লির লাজপত নগর, সরোজিনী নগর-সহ বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণের কারণে বড়সড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষিতে তিনি সুপ্রিম কোর্টের কাছে দিল্লি পুরনিগমকে নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন, যাতে রাজধানীজুড়ে বেআইনি নির্মাণ ও আবাসিক ভবনের বাণিজ্যিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের বিস্তারিত হলফনামা জমা দেওয়া হয়।
এছাড়া এমসিডি এলাকার সমস্ত ভবনের স্ট্রাকচারাল অডিট, বেআইনি ভবনগুলির নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ভাঙা বা সিল করা, ধসে পড়া ভবনটি কীভাবে এতদিন টিকে রইল তার ব্যাখ্যা এবং দায়ী আধিকারিকদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থার তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
অ্যামিকাস কিউরি দিল্লি সরকার ও দিল্লি পুলিশের কাছ থেকেও অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট (এটিআর) চেয়েছেন। পাশাপাশি মৃতদের পরিবারকে কী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্যও হলফনামার মাধ্যমে আদালতে জমা দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
— আইএএনএস
























