কোচি, ৭ জুন (আইএএনএস): মালয়ালম চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয় অভিনেতা ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী সেলিম কুমার আর নেই। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ের পর শনিবার রাত প্রায় ১০টা ৪৫ মিনিটে কোচির একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।
উত্তর পারাভুরে তাঁর বাড়ির নাম ছিল ‘লাফিং ভিলা’। নিজের অনবদ্য কৌতুকাভিনয় ও প্রাণখোলা ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিত সলিম কুমারের বাড়ি একসময় হাসি-আনন্দে মুখর থাকলেও তাঁর প্রয়াণে এখন সেখানে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
চিকিৎসকরা জানান, গত কয়েক বছর ধরে তিনি লিভারজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। কোচির অমৃতা হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
এর আগে সলিম কুমার নিজেই জানিয়েছিলেন যে তিনি লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এই রোগ মদ্যপানের কারণে নয়, বরং বংশগত কারণে হয়েছে। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও মানসিক লড়াইয়ের কথাও তিনি খোলাখুলিভাবে ভাগ করে নিয়েছিলেন।
মিমিক্রি শিল্পী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ধীরে ধীরে মালয়ালম সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা হয়ে ওঠেন তিনি। পরে গম্ভীর ও আবেগঘন চরিত্রেও নিজের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ দেন। প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি প্রায় ১২০টি ছবিতে অভিনয় করেন এবং তিনটি চলচ্চিত্র পরিচালনাও করেন।
‘থেঙ্কাসিপট্টনম’, ‘ই পারাক্কুম থালিকা’, ‘মীশা মাধবন’, ‘সি.আই.ডি. মুসা’, ‘কল্যাণরামন’ ও ‘পুলিভাল কল্যাণম’-এর মতো ছবিতে তাঁর কৌতুকাভিনয় দর্শকদের মন জয় করেছিল। অন্যদিকে ‘আচানুরাঙ্গাথা ভীডু’ ও অ্যাডামিন্টে মাকান আবু-এর মতো ছবিতে তাঁর সংবেদনশীল অভিনয় সমানভাবে প্রশংসিত হয়।
‘আদামিন্টে মাকান আবু’ ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া একাধিক কেরল রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কারও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে। পরিচালক হিসেবেও তিনি সাফল্য পান; তাঁর পরিচালিত ‘করুথা জুথান’ ছবির গল্প ২০১৭ সালের কেরল রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।
তাঁর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন কেরলের মুখ্যমন্ত্রী ভি. ডি. সাথীসান। এক আবেগঘন বার্তায় তিনি বলেন, “মালয়ালম সিনেমা শুধু একজন প্রতিভাবান অভিনেতাকে হারায়নি, আমি হারিয়েছি আমার এক ভাইকে।” মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “সলিম কুমার অভিনয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্বমানের উৎকর্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর মুখের একদিকে ছিল হাসি, অন্যদিকে ছিল মানুষের চোখে জল আনার ক্ষমতা।”
রবিবার সকালে তাঁর মরদেহ উত্তর পারাভুর টাউন হলে জনসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হয়। সেখানে চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক নেতা এবং অসংখ্য অনুরাগী শেষ শ্রদ্ধা জানান।
দুপুরে মরদেহ তাঁর বাড়ি ‘লাফিং ভিলা’-য় নিয়ে যাওয়া হবে। বিকেল ৩টায় শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর সন্ধ্যায় তাঁকে সমাধিস্থ করা হবে।
সলিম কুমারের পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী সুনীতা এবং দুই পুত্র চন্দু ও আরোমল।
তাঁর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন মালয়ালম সুপারস্টার মাম্মুটি-ও। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, “তোমার চলে যাওয়া এক অন্তহীন বেদনা, ভাই। তুমি মানুষকে হাসিয়েছ, ভাবিয়েছ, কাঁদিয়েছ। আজ তুমি আমাদের চোখে শুধু অশ্রু রেখে গেলে।”
মালয়ালম সিনেমার ইতিহাসে সলিম কুমার এমন এক শিল্পী, যিনি প্রমাণ করেছিলেন যে হাসির মধ্যেও গভীর মানবিকতা, আবেগ এবং জীবনের সত্য লুকিয়ে থাকতে পারে। তাঁর কণ্ঠ আজ স্তব্ধ হলেও, তাঁর অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র দর্শকদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
________



















