নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ৭ জুন: তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে বিধায়িকা কল্যাণী সাহা রায়ের আকস্মিক পরিদর্শন এবং মহকুমা স্বাস্থ্য আধিকারিকের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। এই ঘটনায় বিধায়িকার ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী। অন্যদিকে, বিরোধী দলনেতার বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়ন এবং হাসপাতালের অনিয়মের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বিধায়িকা কল্যাণী সাহা রায়।
শনিবার তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শনে যান তেলিয়ামুড়া বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়িকা তথা রাজ্য বিধানসভার মুখ্যসচেতক কল্যাণী সাহা রায়। পরিদর্শনকালে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে অনিয়ম, কর্মীদের অনুপস্থিতি এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত নানা অভিযোগ তাঁর নজরে আসে। এরপর মহকুমা স্বাস্থ্য আধিকারিক রাজা জমাতিয়ার সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা।
রবিবার এই প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী বলেন, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে হাসপাতাল পরিদর্শন করা বিধায়িকার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তবে তিনি যে পদ্ধতিতে ক্যামেরা ও দলবল নিয়ে একজন সরকারি আধিকারিককে জনসমক্ষে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বিরোধী দলনেতার অভিযোগ, বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই কিছু জনপ্রতিনিধি নিজেদের প্রচারের আলোয় রাখতে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়টি প্রশাসনিক বৈঠক ও পর্যালোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত।
স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রসঙ্গে জিতেন্দ্র চৌধুরী বলেন, তেলিয়ামুড়া হাসপাতালের ঘটনাটি আসলে রাজ্যের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেছে। তাঁর অভিযোগ, গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য দপ্তরে প্রয়োজনীয় শূন্যপদ পূরণ করা হয়নি, ফলে রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতাল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটে ভুগছে। সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে বিরোধী দলনেতার বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিধায়িকা কল্যাণী সাহা রায়। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজের পরিকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষায়িত চিকিৎসা পরিষেবার সম্প্রসারণ, নতুন হাসপাতাল নির্মাণ এবং চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই সরকার কাজ করছে। কিন্তু বাম আমলে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।
বিধায়িকার দাবি, তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটের মূল কারণ মাঠপর্যায়ের কিছু প্রশাসনিক গাফিলতি। তিনি জানান, হাসপাতালের পরিষেবা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ আসছিল। বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য আধিকারিকদের নজরে আনা হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। তাই জনস্বার্থে তিনি সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
কল্যাণী সাহা রায় আরও বলেন, তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে বর্তমানে ১৪ জন চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। তারপরও সাধারণ মানুষ কেন কাঙ্ক্ষিত পরিষেবা পাচ্ছেন না, সেটিই তিনি জানতে চেয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, হাসপাতালের কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
উল্লেখ্য, তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসা পরিষেবার মান, কর্মীদের উপস্থিতি, ওষুধ সরবরাহ, রোগী কল্যাণ তহবিলের ব্যবহার এবং দালালচক্রের সক্রিয়তা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উঠছিল। শনিবারের পরিদর্শনে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকসহ কয়েকজন কর্মীর অনুপস্থিতির বিষয়ও সামনে আসে বলে দাবি করেন বিধায়িকা।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর তীব্র আকার ধারণ করেছে। একদিকে বিরোধী দলনেতা প্রশাসনিক শালীনতা বজায় রাখার পক্ষে সওয়াল করেছেন, অন্যদিকে বিধায়িকা হাসপাতালের অনিয়ম ও জনস্বার্থে নিজের পদক্ষেপকে সঠিক বলে দাবি করেছেন। ফলে তেলিয়ামুড়া হাসপাতাল বিতর্ক এখন রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।



















