নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২ মার্চ৷৷ মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেবের সভাপতিত্বে উপজাতি উপদেষ্টা কমিটির সভা আজ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হয়৷ ২০১৯ সালে এই কমিটি পূণর্গঠিত হয়৷ উপজাতি উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান হলেন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব৷ উপমুখ্যমন্ত্রী ষীষ্ণু দেববর্মা, উপজাতি কল্যাণমন্ত্রী মেবার কুমার জমাতিয়া, সমাজ কল্যাণ ও সমাজ শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী সান্তনা চাকমা, ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্ব-শাসিত জেলা পরিষদের মুখ্য কার্যনির্বাহী সদস্য রাধাচরণ দেববর্মা, মুখ্যসচিব মনোজ কুমার সভায় জনজাতিদের সামগ্রিক কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচির পর্যালোচনা করেন এবং সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন৷
সভায় মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব জনজাতিদের উন্নয়নে এবং জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার পরিকাঠামোগত উন্নয়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন৷ জনজাতি সম্পদায়ের আর্থ-সামাজিক মানোন্নয়নে বিভিন্ন সহযোগী দপ্তরকে লক্ষমাত্রা স্থির করে কাজ করার পরামর্শ দেন৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জনজাতি এলাকায় কাজ করতে কোন অসুুবিধার সম্মখীন হলে তা সাথে সাথেই ঐ এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে সমাধান করতে হবে৷ তা কোনভাবে ফেলে রাখা যাবেনা৷ দুর্গম বা প্রত্যন্ত এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ রূপায়ণ করা যাবেনা তা হতে পারে না৷ বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলে সবক্ষেত্রেই সমাধান সম্ভব বলে মুখ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন৷ নির্মাণ সম্পর্কিত কাজের ক্ষেত্রে গুণমান বজায় রাখার কথাও ব্যক্ত করেন মুখ্যমন্ত্রী৷ এজন্য পূর্ত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, একলব্য মডেল রেসিডেনসিয়াল সুকল নির্মাণের ক্ষেত্রে জমি চিহ্ণিতকরণের কাজ যত দ্রত সম্ভব সম্পন্ন করতে হবে৷ এ ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের ’ল্যাণ্ডব্যাংক’-এ চিহ্ণিত করা জমিকে অগ্রাধিকার দিতে তিনি পরামর্শ দেন৷ একলব্য মডেল রেসিডেনসিয়াল সুকলে ভর্তির ক্ষেত্রে পারিবারিক আয়ের সীমা নির্দিষ্ট করে দিতে মুখ্যমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশ দেন৷ জমিয়াদের পূণর্বাসন দিয়ে তাদের জীবনমান উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি৷ আজকের বৈঠকে ২০১৭ সালের ৯ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত উপজাতি উপদেষ্টা কমিটির সর্বশেষ সভার এজেণ্ডা সমূহ নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়৷ জনজাতি এলাকায় রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণ, হার্ডকোর জমিয়া পুনর্বাসন, জনজাতিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, শিক্ষা ও ভাষাগত উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়সমূহ আলোচনায় উঠে আসে৷ উপজাতি কল্যাণ দপ্তরের সচিব এন ডার্লং এজেণ্ডা অনুসারে বিস্তারিত বিষয় বৈঠকে উপস্থাপন করেন৷ তিনি জানান, জনজাতি এলাকার ৯১টি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ককবরক ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসাবে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে৷ এরজন্য ককবরক ভাষার শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও সভায় আলোচিত হয়৷ ককবরক শিক্ষকের শূণ্যপদে
নিয়োগের বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য মুখ্যমন্ত্রী বিদ্যালয় শিক্ষাদপ্তরের সচিবকে নির্দেশ দেন৷ এছাড়াও জনজাতি এলাকার বিদ্যালয়গুলিতে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক পোষ্টিং দেওয়ার জন্য বিস্তারিত আলোচনা হয়৷ এছাড়াও এদিনের সভায়, ২০১৮-১৯ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে রাজ্যে যে ১৮টি একলব্য মডেল রেসিডেনশিয়াল সুকল নির্মাণের জন্য ঘোষণা করা হয়েছিল, সেগুলির সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে আজকের সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়৷ ২০১৯-২০ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় উপজাতি মন্ত্রক ৪টি একলব্য মডেল রেসিডেনশিয়াল বিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়৷ করবুক, মুঙ্গিয়াকামী, হেজামারা ও রূপাইছড়ি ব্লকে এইসব বিদ্যালয় নির্মিত হবে৷ উপজাতি কল্যাণ দপ্তরের সচিব সভায় জানান, এই মডেল বিদ্যালয়গুলি নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ন্যাশ্যানাল এডুকেশন সোসাইটি ফর ট্রাইবেল স্টুডেন্ট (এন ই এস টি এস)৷
এদিনের সভায় বনাধিকার আইন-২০০৬ অনুসারে যারা জমির পা-া পেয়েছেন, তাদের জীবনমান উন্নয়নে কি কি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তা নিয়েও আলোচনা হয়৷ সভায় প্রদত্ত তথ্যে জানা গেছে এখন পর্যন্ত ১ লক্ষ ৩০ হাজার ৯০৩ পরিবারকে বনাধিকার আইনে জমির পা-া দেওয়া হয়েছে৷ মোট জমির পরিমান ১ লক্ষ ৮৬ হাজার ২২৯ হেক্টর৷ এরমধ্যে স্টেট প্ল্যান ও এম জি এন রেগার মাধ্যমে মোট ৫৬,৩৭০.৮১ হেক্টর জমিকে কাজে লাগিয়ে জনজাতিদের আর্থ-সামাজিক মানোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে৷ বনাধিকার আইনে জমির পা-া প্রদানের পর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত মোট উপক’ত হয়েছেন ১ লক্ষ ৯ হাজার ৬৬২ পরিবার৷ সভায় বছরভিত্তিক লক্ষমাত্রা নির্দিষ্ট করে জনজাতি সম্পদায়ের পা-াপ্রাপক পরিবারগুলির জন্য উদ্যোগ নেওয়ার জন্য উপজাতি কল্যাণ দপ্তরকে বলা হয়েছে৷ সভায় প্রদত্ত তথ্য অনুসারে স্পেশাল সেন্ট্রাল আ্যাসিস্ট্যান্স – ট্রাইবেল সাব-স্কীমে ২০১৮-১৯ সালে দক্ষতা উন্নয়নে ৬০৪ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে৷ এই প্রকল্পে ২০১৮-১৯ সালে ১২১টি পরিবারকে ১ হেক্টর রাবার বাগান করে দেওয়া হয়েছে৷ আনারস, কলা ও সুুপারি চাষ করার জন্য ৬৬৭টি পরিবারকে সহায়তা করা হয়েছিল৷ মৎস্যচাষের জন্য সাহায্য করা হয়েছিল ৫০০ পরিবারকে৷ শুকর পালন, ছাগল পালন ও পোল্টি পালন সহায়তা পেয়েছেন ৪০০ পরিবার৷
চলতি বছরে দক্ষতা উন্নয়নে ৩৫২ জন, ক’ষিক্ষেত্রে ১,৫০০ জন ক’ষক, উদ্যান পালনে ৮৫০ জন ক’ষক, শুকর ও মাছ চাষে যৌথভাবে ৩৪০ জন, পশুপালনে ৪২৫ জনকে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল৷ এরমধ্যে ক’ষি, শুকর পালন ও মৎস্যচাষে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে৷ সভায় জনজাতি সম্পদায়ের ছাত্রছাত্রীদের ছাত্রাবাসগুলির সংস্কার, পানীয়জলের ব্যবস্থা, নতুন করে যেসব ছাত্রাবাসের নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে সেগুলি চালু করা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার হয়েছে৷ সভায় বিধায়ক দিবাচন্দ্র রাংখল, বিধায়ক প্রভাত চৌধুরী, বিধায়ক রামপদ জমাতিয়া, বিধায়ক ডঃ অতুল দেববর্মা, বিধায়ক সিন্ধ চন্দ্র জমাতিয়া, বিধায়ক বুর্বমোহন ত্রিপুরা, বিধায়ক ব’ষকেতু দেববর্মা, বিধায়ক শম্ভুলাল চাকমা, বিধায়ক যশবীর ত্রিপুরা, বিধায়ক ধীরেন্দ্র দেববর্মা, বিধায়ক বীরেন্দ্র কিশোর দেববর্মা, বিধায়ক ধন’য় ত্রিপুরা আলোচনায় অংশ নেন৷ এছাড়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান সচিব, সচিব ও অন্যান্য আধিকারিকরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন৷


















