করিমগঞ্জ (অসম), ২ ফেব্রুয়ারি (হি.স.) : কেন্দ্র এবং রাজ্যের শাসকদলের নেতা ও মন্ত্রীরা আপাদমস্তক মিথ্যাবাদী। ওঁদের মুখে ভুলেও কখনও সত্য কথা বের হয় না। শুধুমাত্র ভোটের স্বার্থে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়াই হলো এঁদের মূল উদ্দেশ্য। গেরুয়া দলের শাসনামলে দেশের বাঙালিদের অস্তিত্ব আজ চরম সঙ্কটের মুখে। রবিবার করিমগঞ্জে এক জনজাগরণ সভায় এভাবেই বিজেপির বিরুদ্ধে কামান দেগেছেন সর্বভারতীয় মহিলা কংগ্রেসের সভানেত্রী তথা শিলচরের প্রাক্তন সাংসদ সুস্মিতা দেব।
নাগরিকত্ব আইনের সমর্থনে কয়দিন আগে আয়োজিত জনজাগরণ সভায় করিমগঞ্জ শহরের যে স্থানে দাঁড়িয়ে কংগ্রেসকে তুলোধুনো করেছিলেন বিজেপি সাংসদ রাজদীপ রায়, রবিবার সেই একই স্থানে দাঁড়িয়ে বিজেপি-র বিরুদ্ধে পাল্টা কামান দেগে তাঁদের হিন্দুত্ববাদ, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং দেশের উন্নয়ন নিয়ে দল ও সরকারের কঠোর সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন সুস্মিতা। জেলা কংগ্রেসের উদ্যেগে আহূত জনজাগরণ সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত হয়ে শিলচরের প্রাক্তন সাংসদ তথা সর্বভারতীয় মহিলা কংগ্রেস সভানেত্রী সুস্মিতা দেব বলেন, বিজেপি-র নেতা ও মন্ত্রীরা মিথ্যা কথায় পারদর্শী। ওঁরা সত্য কথা কখনও বলেন না। শুধু ভোটের স্বার্থে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি করাই হলো এঁদের মূল লক্ষ্য। বিজেপি সরকারের কার্যকালে বাঙালিদের অস্তিত্ব আজ সঙ্কটের মুখে। কংগ্রেস সকল জাতি গোষ্ঠীর ভাষা এবং সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করে। তাই বলে আমাদের ভাষা সংস্কৃতিকে হনন করার অধিকার আমরা কাউকে দেইনি। বাঙালিরা লড়াই করে তাঁদের অস্তিত্বের জানান দেবে, জনসভায় হুঙ্কার দেন সুস্মিতা দেব।
সর্বভারতীয় মহিলা কংগ্রেসের সভানেত্রী তথা প্রাক্তন সাংসদ সুস্মিতা দেব সিএএ নিয়ে বিজেপি নেতাদের কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, এই আইন একটি ললিপপ মাত্র। উদ্বাস্ত হিন্দু বাঙালিদের সুরক্ষা দিতে পারবে না এই আইন। কিন্ত সত্য কথাটা জনসমক্ষে বলার মতো সাহস নেই বিজেপি নেতা ও মন্ত্রীদের। হিন্দুদের ধ্বজাধারী বিজেপি ক্ষমতায় এসে হিন্দুদের সুরক্ষা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। সুস্মিতা বলেন, সাংসদ রাজদীপ রায় নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে বাঙালিদের কাছে বিজেপির জয়গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন। কিন্ত, তাঁদের দলের সরকারের হাতে ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হচ্ছে, বিএসএনএল-এর অকালমৃত্যু ঘটছে, উন্নয়ন বলতে কিছুই নেই, পাঁচগ্রাম পেপার মিল বন্ধ হয়ে গিয়েছে, এলআইসি বেসরকারীকরণের পথে, নেই চাকরি, বেকারত্ব হু হু করে বাড়ছে। কিন্ত এর পরও ওঁরা কীভাবে বলেন সব কা সাথ সব কা বিকাশ। ওদের লজ্জা থাকা উচিত।
এনআরসি প্রসঙ্গে সুস্মিতা বলেন, বিজেপি সরকার ইচ্ছে করে অসমে এনআরসি কার্যকর করতে ঘোষণা করছে না। সদ্যঘোষিত এনআরসি নিয়ে সরকারের পরবর্তী সিদ্বান্তের দিকে মানুষ তাকিয়ে রয়েছেন। কিন্ত বিজেপি ভোটের স্বার্থে সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁদের উদেশ্য ডিটেনশন ক্যাম্পে এনআরসি-ছুট বাঙালিদের পাঠিয়ে দেওয়া। সুতরাং সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন সুস্মিতা দেব।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, সমাজের সর্বস্তরের নাগরিকদের সুরক্ষা একমাত্র কংগ্রেসই দিতে পারে। বিজেপি সরকারের এবারের অর্থিক বাজেট দেশের মানুষকে ভীষণ হতাশ করেছ। ওঁরা মিথ্যাবাদী, মুখে এক আর বুকে অন্য কথা নিয়ে বসে থাকে। ২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে সচেতন রাজ্যবাসী এর মোক্ষম জবাব দিতে মুখিয়ে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন সর্বভারতীয় নেত্রী সুস্মিতা দেব।
এদিকে বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে বলেন, সাংসদ রাজদীপ রায় ভারতবর্ষের ইতিহাস জানেন না। তিনি করিমগঞ্জ শহরের যে স্থানে দাঁড়িয়ে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের পক্ষে সওয়াল করতে ইতিহাসের অপব্যাখ্যা করেছেন এই স্থানটি স্বাধীনতার পূর্বে সিলেট জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমরা সিলেটের অধীনে ছিলাম। সিলেট জেলা তখন অসম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে দেশ ভাগ হল, খণ্ডিত হল সিলেট। সুতরাং আমরা বহিরাগত নই। আমরা আদি ভারতের নাগরিক। সাংসদ রাজদীপ রায়ের হয়তো এই ইতিহাসটুকু জানা নেই। বিজেপি দল এবং সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বিধায়ক কমলাক্ষ বলেন, বিজেপি নেতারা বর্তমানে নাগরিকত্ব আইনের দোহাই দিয়ে আক্ষরিক অর্থে বাঙালিদের অধিকার হনন করছেন। ধর্মের নামে তাঁরা সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে ঘোলা জলে মাছ ধরার অপেক্ষায় রয়েছেন। অসম চুক্তির ৬ নম্বর দফাকে কার্যকর করতে গিয়ে বাঙালিদের সর্বনাশ ডেকে আনছে বিজেপি দল এবং সরকার। এনআরসি-র নামে বিজেপি সরকার বাঙালিদের চরম হয়রানি করেছেন। বরাকের মানুষকে নথি পরীক্ষার নামে শত শত কিলোমিটার দূরে ডেকে পাঠনো হয়েছে। এর পরও ১৯ লক্ষ লোকের নাম নেই চূড়ান্ত তালিকায়। কিন্তু নাগরিকত্ব আইন তো এ-সব এনআরসি-ছুট হিন্দু বঙ্গভাষী লোকদের কোনও সহায়তা করতে পারবে না। কারণ, এনআরসি-র আবেদনে তাঁরা তো ভারতীয় হিসেবে প্রামাণ্য নথি দাখিল করে ফেলেছেন। সুতরাং বিজেপি নেতাদের সঠিক সময়ে এ-সব কথার উপযুক্ত জবাব দেবেন রাজ্যের বঙ্গভাষী জনসাধারণ।
বিধায়ক বলেন, নাগরিকত্ব আইনের দোহাই দিয়ে বাঙালিদের চাকরি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ভূমি এবং সর্বোপরি গণতান্ত্রিক অধিকার যদি কেড়ে নেওয়া হয় তা-হলে এই আইন আমরা চাই না।
জেলা কংগ্রেস সভাপতি সতু রায় প্রাসঙ্গিক বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে বলেন, সাংসদ রাজদীপ রায় ভারতবর্ষের ইতিহাস জানেন না। তাই তাঁকে ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস অধ্যয়নের পরামর্শ দেন সতুবাবু। তাছাড়া বিজেপি দলের ইতিহাসকে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস বলে তিনি উল্লেখ করেন। বলেন, দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য কংগ্রেস নেতারা যখন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছেন, তখন বিজেপি দলের কিছু নেতা ব্রিটিশের দালালিতে লিপ্ত ছিলেন। সুতরাং বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস থেকেই বিজেপি দলের জন্ম বলে অভিযোগ তুলে বক্তব্য পেশ করেছেন জেলা কংগ্রেস সভাপতি সতু রায়।
আজকের জনজাগরণ সভায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তথা প্রাক্তন বিধায়ক মণিলাল গোয়ালা, উত্তম মজুমদার, সুব্রত দেব, তাপস পুরকায়স্থ, রজত চক্রবর্তী, জেলা মহিলা কংগ্রেস সভানেত্রী সংঘমিত্রা দাস, শাহদত আহমদ চৌধুরী প্রমুখ।


















