মুম্বই, ৮ অক্টোবর (আইএএনএস): ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা, অভিনয়ের মহীরুহ এবং সমাজকর্মী বিশ্বনাথ ‘নানা’ পাটেকর বৃহস্পতিবার ৭৫ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন। তীব্র বাস্তবধর্মী অভিনয়, আবেগের গভীরতা এবং পর্দায় তাঁর শক্তিশালী উপস্থিতির জন্য তিনি যেমন দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন, তেমনই জীবনের শেষ পর্বে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য তাঁর কাজও তাঁকে এক অনন্য পরিচয় এনে দেয়।
বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ গ্রামীণ অঞ্চলগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে নানা পাটেকর শুধু অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন আশার প্রতীক। জল সংরক্ষণ, কৃষক কল্যাণ এবং কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়াতে নিজের সময়, অর্থ ও প্রভাব কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি।
নানা পাটেকরের শিল্পীজীবনের সূচনা হয়েছিল থিয়েটারের মঞ্চে। পরে মারাঠি ও হিন্দি চলচ্চিত্রে নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। চার দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয় জীবনে একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর অভিনয় ভারতীয় সিনেমায় অ্যান্টি-হিরো, পুলিশ অফিসার এবং জটিল সাধারণ মানুষের চরিত্রকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল।
১৯৮৯ সালের ‘পরিন্দা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার সম্মান পান নানা পাটেকর। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় মূলধারার সিনেমায় আরও গাঢ় ও সূক্ষ্ম চরিত্রায়নের পথ প্রশস্ত করে। ১৯৯৪ সালের ‘ক্রান্তিবীর’ ছবির জন্য সেরা অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। ছবিতে তাঁর শক্তিশালী সংলাপ ও অভিনয়ের বহু দৃশ্য এখনও ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে রয়েছে।
অভিনয়ের বিস্তৃত পরিসরের জন্যও পরিচিত ছিলেন নানা পাটেকর। ‘আব তক ছাপ্পান’ এবং ‘অস্তিত্ব’-এর মতো তীব্র ও গম্ভীর ছবির পাশাপাশি ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’-এর মতো সমালোচকদের প্রশংসিত ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। আবার ‘ওয়েলকাম’-এর মতো জনপ্রিয় কমেডি ছবিতেও নিজের অভিনয়ের ভিন্ন দিক তুলে ধরেন। ২০১৬ সালের প্রশংসিত মারাঠি ছবি ‘নটসম্রাট’-এ তাঁর অভিনয় তাঁর থিয়েটারের গভীর শিকড়কে আরও একবার সামনে নিয়ে আসে। ছবিতে তাঁর অভিনয় আধুনিক ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় অভিনয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
তবে চলচ্চিত্রে বিপুল সাফল্যের পর জীবনের শেষ পর্বে নানা পাটেকরের মনোযোগ ক্রমশ মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ এলাকার দিকে চলে যায়। মারাঠওয়াড়া ও বিদর্ভের কৃষক সংকট এবং ভয়াবহ খরার পরিস্থিতি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এরপর তিনি তৃণমূল স্তরে সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার পরিবর্তনে, বিশেষ করে জল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁর কাজকে সমাজের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা পূরণের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতেন নানা পাটেকর। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর অন্যতম আগ্রহ ছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে মারাঠি অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে মিলে কৃষি সংকট ও কৃষক আত্মহত্যার প্রেক্ষাপটে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গড়ে তোলেন নানা পাটেকর। প্রতীকী সাহায্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি নিজে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির কাছে পৌঁছে যেতেন। নিজের সঞ্চয় থেকে প্রাথমিক তহবিল দিয়ে কাজ শুরু করার পাশাপাশি শহর ও গ্রামের মানুষের সমর্থনও সংগঠিত করেন তিনি।
নানা পাটেকর বুঝেছিলেন, স্থায়ী সমাধানের জন্য সাময়িক আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি প্রয়োজন জলসম্পদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা। সেই কারণে তাঁর সংস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট ও জল নিরাপত্তা। নদী, খাল, নালা ও জলাশয়ে জমে থাকা পলি সরাতে বিভিন্ন এলাকায় মাটি কাটার যন্ত্র ব্যবহার করে বিস্তৃত পরিসরে কাজ করা হয়।
বিড জেলার ঋদ্ধি সিদ্ধি নদীর পুনরুজ্জীবন এবং পুস নদীকে ঘিরে বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে শুকিয়ে যাওয়া নদীখাতগুলিতে ফের জলধারণ ক্ষমতা তৈরি হয়। ভূগর্ভস্থ জলস্তর পুনরুদ্ধার হওয়ায় বহু এলাকার কুয়ো ও বোরওয়েলেও জল ফিরে আসে। পাশাপাশি খামার পুকুর এবং চেক-নালা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে বহু গ্রামে জরুরি ভিত্তিতে জল সরবরাহকারী ট্যাঙ্কারের উপর নির্ভরতা কমে।
কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির বিধবা ও নির্ভরশীল সদস্যদের সরাসরি আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি সেলাই মেশিন, আটা কলের মতো জীবিকা নির্বাহের সরঞ্জাম এবং গবাদি পশুও দেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলা।
অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি গ্রামকে দত্তক নিয়ে সেগুলিকে স্বনির্ভর গ্রামীণ ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগও নেওয়া হয়। পরিষ্কার পানীয় জল, সমবায়ী কৃষি ব্যবস্থা, উন্নত স্যানিটেশন এবং সামাজিক পরিকাঠামোর মতো বিষয়গুলিকে এই উদ্যোগের আওতায় আনা হয়েছিল।
নানা পাটেকরের জীবন তাই শুধু রুপোলি পর্দায় অসাধারণ অভিনয়ের গল্প নয়। তাঁর উত্তরাধিকার ছড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের পাশাপাশি পুনরুজ্জীবিত নদী, সবুজ কৃষিজমি এবং স্বনির্ভর হয়ে ওঠা বহু গ্রামীণ মানুষের জীবনেও। অভিনয়ের শিখর থেকে সরাসরি সমাজের মাটিতে নেমে কাজ করার এই যাত্রাই তাঁকে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণীয় করে রাখবে।



















