নয়াদিল্লি, ১৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): বাংলাদেশের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এর আওতায় চিনের পরিকাঠামো উন্নয়ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডরগুলিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি চিনা পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল প্রবেশের সুযোগ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে সড়ক, সেতু, রেলপথ ও বন্দর নির্মাণের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগর এবং বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিনের কৌশলগত প্রভাবও বাড়তে পারে বলে এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এশিয়ান লাইট ইন্টারন্যাশনাল-এর এক প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ড. সাকারিয়া করিমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের পরিকাঠামো ক্ষেত্রে চিনের এই ভূমিকা শুধু অর্থনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে বৃহত্তর ভূ-কৌশলগত তাৎপর্যও যুক্ত রয়েছে।
করিম তাঁর বিশ্লেষণে ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে গড়ে ওঠা রেলপথের সঙ্গে চিনের বর্তমান পরিকাঠামো উদ্যোগের তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, ব্রিটিশ আমলে বোম্বে, কলকাতা ও মাদ্রাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলিকে দেশের অভ্যন্তরভাগের সঙ্গে রেলপথে যুক্ত করা হয়েছিল। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কাঁচামাল ব্রিটিশ শিল্পে পৌঁছে দেওয়া এবং ব্রিটিশ উৎপাদিত পণ্য ভারতীয় বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া; গোটা উপমহাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছিল না মূল লক্ষ্য।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিআরআই-এর মাধ্যমে চিনের পরিকাঠামো সহযোগিতার মধ্যেও নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চিনের সহায়তায় সড়ক ও সেতুর পাশাপাশি সমুদ্রবন্দর পরিকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে, যা বাংলাদেশের বাজারে চিনা প্রস্তুত পণ্য এবং আংশিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পসামগ্রী পৌঁছনোর পথ আরও সহজ করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চিনের সহায়তায় গড়ে ওঠা পরিকাঠামোর ভৌগোলিক বিস্তার বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিআরআই-এর বড় অংশের প্রকল্প কেন্দ্রীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে কেন্দ্রীভূত। এই দুই অঞ্চল দেশের তুলনামূলকভাবে উন্নত অর্থনৈতিক এলাকাগুলির মধ্যে পড়ে।
বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নদী প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নদীগুলির মোহনার আশপাশে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর রয়েছে। পূর্বদিকে কর্ণফুলি নদী চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল থেকে জল বহন করে চট্টগ্রামের কাছে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে।
বাংলাদেশের পরিবহণ ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ জলপথের ঐতিহাসিক গুরুত্বও বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে। দেশের মোট পণ্য পরিবহণের অর্ধেকেরও বেশি এবং যাত্রী পরিবহণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অভ্যন্তরীণ জলপথের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এর বিপরীতে ভারতে মোট পণ্য পরিবহণের মাত্র প্রায় ২ শতাংশ অভ্যন্তরীণ জলপথের মাধ্যমে হয় বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিনের সহায়তায় নির্মিত বহু সড়ক ও সেতু প্রকল্প এই গুরুত্বপূর্ণ নদী ব্যবস্থাগুলির আশপাশে কেন্দ্রীভূত। এগুলি ঢাকা ও চট্টগ্রামকে সমুদ্রবন্দর ও সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে যুক্ত করছে। একই সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র—যা দেশের প্রধান উৎপাদন ও রপ্তানি খাত।
বিশ্লেষকদের মতে, ফলে বাংলাদেশের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক পরিকাঠামো শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে চিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতিও আরও সুদৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
_______



















