কৈলাসহর, ১৪ সেপ্টেম্বর: প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রকে বেত ও বাঁশ দিয়ে বেধড়ক মারধর, টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়ে শারীরিক নির্যাতন এবং কান ধরে হাঁটু গেড়ে মাদ্রাসার মাঠ প্রদক্ষিণ করানোর অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে কৈলাসহরের বড়খলা মাদ্রাসায় চাঞ্চল্য ও ক্ষোভ ছড়িয়েছে। অভিযোগ, মারধরের ঘটনায় ছাত্রটির শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন তৈরি হয়েছে। এদিকে, থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের পরও মামলা রেজিস্ট্রি বা অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছে ছাত্রের পরিবার।
ঘটনাটি কৈলাসহরের ফুলবাড়িকান্দি গ্রাম পঞ্চায়েতের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ বড়খলা গ্রামের বড়খলা মাদ্রাসায়। অভিযোগকারী মনাফ আলীর ১১ বছরের ছেলে জুবেইর আলী ওই মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।
পরিবারের দাবি, প্রতিদিনের মতো গত ১২ সেপ্টেম্বর শনিবার সকালে জুবেইর মাদ্রাসায় যায়। শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা চলাকালীন সময়ে শিক্ষক জুনেল আহমেদ তাকে একটি প্রশ্ন করেন। জুবেইর ওই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় শিক্ষক তাকে বেত দিয়ে সারা শরীরে বেধড়ক মারধর করেন বলে অভিযোগ।
পরিবারের আরও অভিযোগ, এরপরও ছাত্রটিকে রেহাই দেওয়া হয়নি। তাকে টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়ে বাঁশ দিয়ে মারধর করা হয়। এমনকি কান ধরে হাঁটু গেড়ে মাদ্রাসার মাঠ প্রদক্ষিণ করানোর মতো শাস্তি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। মাদ্রাসা থেকে বাড়ি ফিরে যাতে বিষয়টি পরিবারের কাউকে না জানায়, সেজন্য ছাত্রটিকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি পরিবারের।
জুবেইরের বাবা মনাফ আলী দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। শনিবার সারাদিনের কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে ছেলের শারীরিক অবস্থা দেখে এবং তার কাছ থেকে পুরো ঘটনা শুনে তিনি হতবাক হয়ে যান। পরে বিষয়টি নিয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি।
পরিবারের দাবি, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তখন মনাফ আলীকে আশ্বাস দেয় যে, পরদিন ১৩ সেপ্টেম্বর রবিবার বিকেলে সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং ন্যায্য বিচার করা হবে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের এই আশ্বাসের পর প্রথমে ছেলেকে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করান মনাফ আলী।
তবে রবিবার বিকেল গড়িয়ে গেলেও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগ বা আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত রবিবার সন্ধ্যায় কৈলাসহর থানায় গিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন মনাফ আলী।
মনাফ আলীর অভিযোগ, থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পর প্রায় ১৫ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও পুলিশ এখনও মামলাটি রেজিস্ট্রি করেনি। এমনকি অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেফতার করা তো দূরের কথা, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের। এই পরিস্থিতিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
সোমবার দুপুর ১টা নাগাদ স্থানীয় সংবাদ প্রতিনিধিদের দ্বারস্থ হয়ে গোটা ঘটনা তুলে ধরেন মনাফ আলী। তাঁর অভিযোগ, নিজের ছেলের সঙ্গে এমন অমানবিক আচরণের পরও যদি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হবে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, বড়খলা গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বড়খলা মাদ্রাসায় মুশলাখ উদ্দিন ও জুনেল আহমেদ নামে দুজন হুজুর তথা শিক্ষক রয়েছেন। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, দুজনই আসাম রাজ্যের বাসিন্দা। জুবেইর আলীকে শিক্ষক জুনেল আহমেদ মারধর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পাশাপাশি, ঘটনাটি মুশলাখ উদ্দিনের সামনেই ঘটলেও তিনি অভিযুক্ত শিক্ষককে বাধা দেননি বা ঘটনার প্রতিবাদ করেননি বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। এই কারণে জুবেইরের বাবা মনাফ আলী শুধু মারধরের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক জুনেল আহমেদের বিরুদ্ধেই নয়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন না করার অভিযোগে মুশলাখ উদ্দিনের বিরুদ্ধেও কৈলাসহর থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
একদিকে মাদ্রাসার ছাত্রের ওপর নির্মম শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযোগ দায়েরের পরও পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ—দুই বিষয়কে কেন্দ্র করে এলাকায় ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য সামনে আনা হোক এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।



















